রংবদলের রঙিন খেলা পেরুর ভিনিচুনকা


প্রকৃতি সত্যিই বিস্ময়কর ও রহস্যকর এক জায়গা| এখানে রহস্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নিজের মতো করে। আর এই প্রকৃতির রহস্য খুঁজতে মানুষ বার বার ছুটে যায়। 

আমরা হয়তো বৃষ্টির পরে রংধনু সবাই দেখে থাকি কিন্তু বৃষ্টি ছাড়া রংধনু কখনো দেখেছেন! হ্যাঁ বৃষ্টি ছাড়া রংধনু। আপনি বৃষ্টি ছাড়াই রংধনুর সৌন্দর্য এই পৃথিবীর বুকেই উপভোগ করতে পারেন। 

মানুষ তো ভ্রমণ করতে পছন্দ করে থাকে। অজানাকে জানতে ভালোবেসে থাকে। তাই বার বার ছুটে যান সৌন্দর্যের খোঁজে। কখনো শুনেছেন পাহাড় দেখতে ঠিক যেন রংধনুর মতো। দূর থেকে দেখলে নানা রঙের কেক বা রেইনবো কেকের মতোও মনে হয়। 

আর যদি এমন রঙের ছড়াছড়ি মাখা পাহাড় দেখতে চান তবে আপনাকে যেতে হবে পেরুতে। এমনই অবিশ্বাস্যকর এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের পাহাড় হলো পেরুর মাউন্ট ভিনিচুনকা। রং বদলের রঙিন খেলা ভিনচুনকা যেন তার রং প্রকৃতির মতো করে বদলায় এখানে।

ভিনিচুনকা দ্যা রেইনবো  মাউন্টেন

দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ হলো পেরু। এই দেশটি নিয়ে না বললেই না কারণ এই দেশটি আসলেই এক সৌন্দর্যের খনি। দেশটির পুরো নাম হলো পেরু প্রজাতন্ত্র। 

দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম-মধ্য অঞ্চলের একটি রাষ্ট্র হলো পেরু যা প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত। জনবিরল মরুভূমি, সবুজ মরূদ্যান, বরফাবৃত পর্বতমালা, উচ্চ মালভূমি এবং গভীর উপত্যকা পেরুর সৌন্দর্য যেন আরো বর্ধিত করেছে। 

১৯ শতকের শুরুর দিকে পেরু স্বাধীনতা লাভ করে থাকে। ভ্রমণ পিপাসুদের তালিকায় পেরু  সবসময় একটি শীর্ষ নাম দখল করে আছে। প্রতি বছরই লাখ লাখ পর্যটক পেরু ভ্রমণ করতে যান এবং দেশটির অন্যান্য সব সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন। পেরু শুধু তার অপূর্ব প্রকৃতির জন্য নয়, পেরু প্রাচীন ঐতিহ্য, সভ্যতার জন্যও এক মহামিলন কেন্দ্র পরিগণিত হয়।

পেরুভিয়ান আন্দেজের অসাঙ্গাতে পর্বতাঞ্চলে এমন অসংখ্য পাহাড় রয়েছে যেগুলোর রঙ একটি অপরটি থেকে আলাদা ও ভিন্ন। কোনোটি দেখতে গাঢ় মেরুন রঙের তো কোনোটার রং উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের। তবে এইসকল পাহাড়ের মধ্যে সুন্দরের রানী বলা যায় মাউন্ট ভিনিচুনকাকে।

আর এই পাহাড়টি হলো অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী। এই পাহাড়ের রঙের ভিন্নতার জন্য একে রেইনবো পাহাড় বা রংধনু পাহাড় নামেও ডাকা হয়ে থাকে। রংধনুতে যেমন সাত রঙের ছড়াছড়ি থাকে এই পাহাড় দেখেও তাই মনে হয়ে থাকে সবার।

তাছাড়া  পেরুভিয়ানে রয়েছে অ্যামাজনের ফুটন্ত পানির নদী। এই ফুটন্ত পানির নদী থেকে শুরু করে মিল্লাপুর প্রকৃতির উপহ্রদ কিংবা কসকোর রংধনু পাহাড় যা দেখে পর্যটক মুগ্ধ হতে বাধ্য। প্রকৃতি এখানে একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই সেজে রয়েছে। 

আসুন জেনে নেয়া যাক পেরুর সেই রহস্যময় ভিনিচুনকার সৌন্দর্য সম্পর্কে-

ভিনিচুনকা পাহাড়ের অবস্থান 

এই ভিনিচুনকা পাহাড় পেরুর পর্বতমালা কুজকো শহর থেকে একই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত (একই নামের অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র)। পুরো পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মেরুন, ফিরোজা, হলুদ, ল্যাভেন্ডা রঙ। পেরুভিয়ান আন্দেজের অসাঙ্গাতে পর্বতাঞ্চলে এমন অনেক পাহাড় রয়েছে যেগুলোর রং একটি অপরটি থেকে আলাদা। 

কোনোটি গাঢ় মেরুন তো কোনোটা উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের। তবে এসব পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যজনক  পাহাড় হলো ভিনিচুনকা। 

ভিনিচুনকাকে রেইনবো মাউন্টেন বা রংধনু পর্বতও নামেও ডাকা হয়ে থাকে। মাত্র কয়েক বছর আগে এই পাহাড়টির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়। স্থানীয় মানুষজন ভিনিচুনকাকে ‘মোনটানা দ্যা কালারস’ নামে ডেকে থাকেন। 

আর পর্যটকদের কাছে এটি রংধনু পাহাড় নামে পরিচিত। এই পাহাড়টির উচ্চতা হলো ৬ হাজার মিটার। এই পাহাড়টির স্তরে স্তরে বিভিন্ন রঙের ছড়াছড়ি।

রংধনু পাহাড়

এই সুন্দর পাহাড়রের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে অদ্ভুত  এক নদী। নাম তার লাল নদী। এই নদী দিয়েই বয়ে চলেছে লাল রঙা পানি যা হুট করে দেখলে মনে হবে কোনো নদীর পানি না এ যেন রক্তের স্রোত ভেসে যাচ্ছে। 

পেরুর এই লাল নদীটি কসকো শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। মূলত এই নদীটির উৎপত্তিস্থল হল পলকোয়ো রংধনু পার্বত্য উপত্যকা৷ আর এই  উপত্যকাটি নানা রকম খনিজে পরিপূর্ণ।

আর এই উপত্যকার যে অংশ দিয়ে লাল নদী বয়ে গিয়েছে সেই অংশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ আয়রন অক্সাইড। বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, পর্বতের ওই অংশ দিয়ে নদী বয়ে যাওয়ার সময় পানির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ আয়রন অক্সাইড মিশে যায় বলেই এই পানির রং হয়ে যায় রক্ত লাল।

আর এই কসকোর লাল নদীর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায় বর্ষাকালের সময়। তবে বছরের অন্যান্য সময় এই নদীর পানি খুব কম থাকায় তখন এর রং থাকে মাটির মতো কালচে বাদামি রঙের। 

ভিনিচুনকা পাহাড়টি অন্য পাহাড় থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। কারণ এই পাহাড়ের রঙ তো সবুজ নয় বরং রংধনুর মতো নানা রঙে রাঙানো। এই পাহাড় থেকে লাল নদীকে পুরোপুরি দেখা যায়। 

তাই আপনি যদি লাল নদীর সৌন্দর্য আর ভিনিচুনকার সৌন্দর্য দুইটাই উপভোগ করতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই যেতে হবে এই পাহাড়ের চূড়ায়।

পাহাড়ে রঙের ভিন্নতা 

পলির চুনাপাথরের শিলা দ্বারা পুরো অঞ্চলটি গঠিত। এই পাহাড়টি দীর্ঘকালের জলবায়ু ও খনিজের উপস্থিতির কারণে এমন রঙ ধারণ করেছে। মাটিতে প্রচুর পরিমানে আয়রন অক্সাইডের কারণে মাটির রং লাল আর আয়রন সালফাইডের আধিক্যের কারণে মাটির রং হলুদ হয়ে গেছে।

এই পাহাড়টি দেখে মনে হয় যেন রংধনুর সমস্ত রং এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যেমন: লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি,সবুজ, ফিরোজা ও উজ্জ্বল রঙের সব রঙ।

এখানে যেন প্রতিনিয়ত রং বদলের খেলা চলে। কারণ সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করে এখানে সবসময় রং পরিবর্তনের খেলা চলতে থাকে। এই রং বদলের খেলা দেখতে এতটাই সুন্দর যে মানুষ বার বার ছুটে যায়।  

কিভাবে যাবেন এই রংধনুর পাহাড়ে 

রংধনুর পাহাড়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই শারীরিক ভাবে ফিট থাকার প্রয়োজন আছে  সেটা হয়তো আপনারা বুঝতেই পেরেছেন। আসলে যারা ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তারা অবশ্যই কষ্ট করে হলেও এই পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে যাবেন।

পেরুতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ইউরোপের অন্য কোথাও থেকে অনেক সহজ। এখন থেকে সহজেই আপনি বাস পেয়ে যাবেন পিটুমারকা গ্রামে পৌঁছানোর জন্য কিন্তু কথা হলো ওই স্থানে গিয়ে তারপর আপনাকে ওসেফিনা যেতে হবে।

রংধনু পাহাড়

সেখান থেকে পর্বত আরোহনের জন্য রওনা দিতে হবে। মোটামুটি ওসেফিনা পৌঁছানোর জন্য প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাগতে পারে। তবে বাকি পথ আপনাকেই পায়ে উঠে যেতে হবে পর্বতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। যদি আপনি ভ্রমণ রসিক হয়ে থাকেন আর তার সাথে এডভেঞ্চার প্রিয় হন তাহলে পেরুর ভিনিচুনকা ভ্রমণ আপনার জন্যই। 

ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময় 

পুরো পেরু ভ্রমণ করতে চাইলে উপযুক্ত সময় হলো মে থেকে নভেম্বর। তবে কসকোর লাল নদী ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় হলো পেরুর বর্ষাকাল। 

সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বর্ষা স্থায়ী হয় এখানে। কারণ এ সময় আবহাওয়াজনিত সমস্যাগুলো সহজেই এড়ানো সম্ভব হয়।আর আপনি যদি চান রঙের খেলা ভিনিচুনকা পর্বতের রূপ উপভোগ করতে তবে আপনাকে এই সময় যেতে হবে। 

সবকিছু মিলিয়ে এপ্রিল বা মে মাস আপনার জন্য সেরা যদি আপনি পেরুতে সুন্দর ভ্রমণ করতে চান আবার তার সাথে লাল পানি নদীর সৌন্দর্যও দেখতে চান। কারণ তখন বর্ষাকাল শেষ হলেও নদীর পানি বাড়তি থাকায় তার রংও থাকে কিছুটা লাল।

ভিনিচুনকা ভ্রমণে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

ভিনিচুনকা কেন আপনি যেখানেই ভ্রমণ করতে যান না কেন আপনাকে অবশ্যই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেসব বিষয়গুলো আপনার খেয়াল রাখা দরকার সেগুলির অল্প কিছু এখানে তুলে ধরা হলো।

  • আপনার যদি উচ্চতা-ভীতি থেকে থাকে তবে অবশ্যই রংধনু পাহাড় ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ সাথে রাখতে হবে।
  • যদি শিশু নিয়ে ভ্রমণ করেন তবে তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সবসময় হাতের কাছেই রাখবেন।
  • আর অবশ্যই আপনার টুরিস্ট গাইডের দেখানো পথেই চলবেন। 

শেষ কথা 

পেরু হলো এক অপরূপ সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। এখানকার পর্বতমালা যেমন সবার নজর কারে তেমনি এখানকার অন্যান্য ভ্রমণের স্থান গুলিও মন কারে পর্যটকদের।

তবে রং বদলের রঙিন খেলা ভিনিচুনকা সবার থেকে একটু বেশিই আকর্ষণীয় পর্যকদের কাছে। প্রকৃতি যেন এখানে তার সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে নিজের হাতে।

ভিনিচুনকা পর্বতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর এখানে পর্যটকদের ভিড় থাকে। রংধনুর রঙে ঘেরা এই পর্বতকে সবার কাছে এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি করে তুলেছে। সময় সুযোগ করে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন এই অপরূপ রূপের এক লীলাভূমি। 

আপনাদের সামনে এই রং বদলের রঙিন খেলা ভিনিচুনকা সম্পর্কে তুলে ধরার একটা ছোট্ট প্রয়াস। আশা করি আপনাদের অবশ্যই ভালো লাগবে। যদি আপনারাও অন্য কোনো বিষয় নিয়ে জানতে চান তাহলে আমাদের অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। 

Explore more

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০ জলপ্রপাত

বিশ্বের সেরা ১০ ফুটবল খেলোয়াড়

আপনার স্বাস্থ্য রক্ষায় ১০ টি উপাদান যুক্ত খাদ্য তালিকার নাম

Recent Posts