খাবার খেয়েই চর্বি কমাতে পারবেন:জেনে নিন ১০টি খাবার সম্পর্কে যা আপনার চর্বি কমাতে সাহায্য করবে


আজকালকার যুগে মেদহীন ছিপছিপে শরীর কে না চায়? শরীরের অতিরিক্ত চর্বিগুলো ঝরিয়ে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে সবার কত চেষ্টা, কেউ জিমে যাচ্ছেন তো কেউবা ডায়েট করে নিজেকে সুস্থ সুন্দর করতে চাচ্ছেন। অনেকেই খাওয়া দাওয়া একদমই কমিয়ে দিচ্ছেন স্লিম হওয়ার আশায়। কিন্তু খেয়েদেয়েও যে চর্বি কমানো যায় সেটা জানেন তো? অবাক হচ্ছেন বুঝি?

আসুন আপনাদের জানাই কোন খাবারগুলো আপনাকে মেদ অর্থাৎ চর্বি কমাতে সাহায্য করবেঃ

আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা থাকে যে খাবার খেলেই বুঝি চর্বি জমে গেলো শরীরে, এই বুঝি মোটা হয়ে গেলাম। এই চিন্তায় আমরা খাবার খাওয়া একদমই কমিয়ে দেই,ক্ষুধা থাকলেও খেতে চাই না। যার ফলাফল হিসেবে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া শরীরে ঠিকমতো পুষ্টির জোগান না পাওয়ায় ত্বকের সমস্যা, চুল পড়া, চেহারায় লাবণ্য কমে যাওয়া, হাত পা ব্যাথা সহ আরও নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পরবর্তীতে এসব সমস্যা আরও বড় আকার ধারণ করার সম্ভবনা থাকে।

আবার অনেক সময় দেখা যায় শরীর অনেকদিন যাবত তার প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়ায়, প্রয়োজনের তুলনায় কম যে খাবারটা পাচ্ছে সেটা থেকেও পুষ্টি আহরণ কমিয়ে দিচ্ছে,পুষ্টিবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘স্টার্ভেশন’ বলা হয়। যখন শরীর খাবারটাকে পুরোপুরি ব্যাবহার করছে না, তখনই এই খাবারটা জমে থেকে শরীরে চর্বি তৈরি করছে এবং আমরা মোটা হচ্ছি।

আবার অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণের অভাবে শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপের গতি ধীর হয়ে যায়। শরীরে মেটাবলিক সিস্টেম দুর্বল হয়ে অনেক আস্তে ধীরে কাজ করে, যার কারণে খাবারের ক্যালরিগুলো সঠিকভাবে বার্ন না হয়ে উলটো জমতে থাকে। ফলশ্রুতিতে যে চর্বি কমানোর জন্য আমরা খাবার কম খাচ্ছি,প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে আমাদের শরীরে আরও বেশি করে চর্বি জমে যাচ্ছে। আমাদের ওজন বাড়ছে,আমরা মোটা হচ্ছি।

তবে কি এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই?কিছুতেই কি কাংখিত সেই দেহের অধিকারী হতে পারবো না? অবশ্যই পারবেন। আজকে এমন কিছু খাবারের কথা আপনাদের জানাবো যা দিয়ে আপনি পেট ভরে খেতে পারবেন, আপনাকে ক্ষুধায় কষ্ট পেতে হবে না, সেই সাথে চর্বি ঝরিয়ে একটি স্লিম ও আকর্ষণীয় দেহের অধিকারীও হতে পারবেন। 

শসাঃ 

শসা

আমরা কমবেশি সবাই জানি চর্বি কমাতে শসার জুড়ি নেই। লো ক্যালরি বা কম ক্যালরিযুক্ত খাবারের তালিকায় শুরুর দিকেই শসার নাম উঠে আসে। এটাকে লো ক্যালরি ফুড বলার কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। ১০০ গ্রাম শসাতে মাত্র ২২ কিলো ক্যালরি থাকে যেখানে পানি থাকে প্রায় ৯০%। তাই শসা খেলে চর্বি জমার কোনো ভয় নেই।

এছাড়া শসা একটি এন্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার। সেই সাথে এতে কিছু পরিমাণ মিনারেলস ও ভিটামিনও থাকে। তাই আজকে থেকেই আপনার খাবার তালিকায় যোগ করুন শসা। প্রতিবেলার খাবারের সাথে শসা থাকলে তা আপনার খাবারের পরিমাণ বাড়াবে, ক্ষুধা মেটাবে সেই সাথে শরীরে মেদ জমতে দিবে না।

শাক-সবজিঃ 

শাক-সবজি

মেদহীন স্লিম শরীরের অধিকারী হতে চাইলে আপনার খাবার প্লেটে অবশ্যই শাক সবজি থাকতে হবে। শাক সবজিতে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও ফাইবার থাকে যা শরীরে জমে থাকা চর্বি কমাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

এসব খাবারে বিদ্যমান ফাইবারগুলো খাবারের চর্বিকণাগুলোকে জালের মতো বেঁধে ফেলে এবং মলমূত্রের সাহায্যে তা শরীর থেকে বের করে দেয়। যার ফলে খাবারের অতিরিক্ত চর্বিগুলো আর দেহে জমতে পারে না। এছাড়া এই খাবারগুলোতে আশঁ জাতীয় উপাদান থাকায়,  এরা আপনার ক্ষুধাভাব কমাবে, যার ফলে আপনি অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারবেন সহজেই।

গ্রীণ টিঃ 

গ্রীণ টি

আজকাল মেদ কমানোর জন্য একটি বহুল পরিচিত নাম হলো গ্রীণ টি। গ্রীণ টি একটি এন্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার। এতে উপস্থিত এন্টিঅক্সিডেন্টটির নাম হলো ফ্লেভোনয়েড। ফ্লেভোনয়েড এমন একটি শক্তিশালী উপাদান যা দেহকে সতেজ ও চাংগা করে তোলে।

গ্রীণ টি হজম প্রক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে দেহের চর্বি ঝরাতে সাহায্য করে থাকে। এছাড়াও গ্রীন টিতে থাকে ভিটামিন-ই এবং ভিটামিন-সি এর চেয়েও অধিক কার্যকর একটি উপাদান, ‘কেটাচিন’, যা পেটের চর্বি কমাতে অনেক বেশি সাহায্য করে থাকে।

তাই সকালে নাস্তার পর অথবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার দুই ঘণ্টা আগে গ্রীণ টি খাওয়ার অভ্যাস করে, শরীরের অতিরিক্ত চর্বিটা কমিয়ে নিতে পারেন আজকে থেকেই। কিন্তু কখনোই খালি পেটে গ্রীণ টি খাবেন না,তাহলে উপকারের জায়গায় অপকার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

বাদাম ও অলিভ অয়েলঃ 

বাদাম ও অলিভ অয়েল

প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন জাতীয় খাবারের পাশাপাশি থাকা উচিত ফ্যাটজাতীয় খাবারও। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব ফ্যাটজাতীয় খাবারই শরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয়, কিছু কিছু খাবার উপকারও করে থাকে। কিছু কিছু ভিটামিন শোষনের জন্য শরীরের ফ্যাট জাতীয় খাবারের প্রয়োজন হয়ে থাকে।বাদাম বা বাদাম জাতীয় খাবার থেকে যে ফ্যাট পাওয়া যায় তাকে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বলা হয়।

এই ফ্যাটের অভাবে ভিটামিন এ,ডি,কে এর অভাব দেখা দিতে পারে। এই ফ্যাট রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। এই ফ্যাট শরীরের মেটাবলিক রেট বাড়িয়ে চর্বি কমাতে ভূমিকা পালন করে।তাই আপনার প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় যোগ করুন কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, কুমড়োর বিচি, শিমের বিচি, অলিভ অয়েলের মতো ফ্যাটযুক্ত খাবার।

সামুদ্রিক মাছঃ 

সামুদ্রিক মাছ

বাদাম জাতীয় খাবারে থাকে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট আর সামুদ্রিক মাছে থাকে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। এটি শরীরের জন্য উপকারী ফ্যাট।  শরীরের মেদ বৃদ্ধিকারক চর্বি দূর করতে সাহায্যকারী ওমেগা ত্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায় সামুদ্রিক মাছে। খাবারের তালিকায় সামুদ্রিক মাছ আপনার রুচি পরিবর্তনেও সাহায্য করে থাকবে সেই সাথে মেদ হ্রাস করতেও কাজ করে যাবে।

তরমুজঃ

তরমুজ

 শসার মতো তরমুজেই পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, যার কারণে এটি খেলে দেহে চর্বি জমতে পারে না। তরমুজে প্রায় ৯২ শতাংশ পানি থাকে যা দেহকে ডিহাইড্রেশনের হাত থেকে রক্ষা করে থাকে অনেকাংশে। এছাড়া তরমুজ ভিটামিন-এ, বি-৬,সি,ফ্যাটি এসিড ও ফাইবারে ভরপুর থাকে। যা চর্বি কমাতে কাজ করে থাকে। তরমুজের আরেকটি উপকারি দিক হলো এটি শরীরের বাড়তি সোডিয়ামকে দূর করে লম্বা সময়ের জন্য শরীরকে ক্ষুধাহীন রাখতে সাহায্য করে।

ওটসঃ

ওটস

মেদ বা চর্বি কমাতে ওটস একটি বহুল জনপ্রিয় খাবার। বেশিরভাগ ডায়েটিশিয়ানরাই সকালের নাস্তায় ওটস রাখতে বলেন। ওটসে বিপুল পরিমাণে ফাইবার থাকে যা আপনাকে সহজে ক্ষুধা পেতে দেয় না। এছাড়া ওটসে রয়েছে ক্ষুধা উদ্রেককারী হরমোনের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য বিটা গ্লুকন। তাই সকালের নাস্তায় ওটস  খেলে আপনি সহজেই দিনের একটি বড় সময় আর কিছু খাওয়া ছাড়াই কাটাতে পারবেন যেটা আপনাকে চর্বি কমাতে সহায়তা করবে।

ডিমঃ

ডিম

অনেকেই চর্বি কমানোর জন্য ডিম খাওয়া ছেড়ে দেন, ভাবেন ডিম খেলেই হয়তো চর্বি বাড়বে। যেটা আদৌ একটা ভুল ভাবনা। ডিম একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। ডিম খেলে সেটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত পেটে থাকে, যে কারণে ক্ষুধাভাব হয় না।যার ফলে অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা কমে যায় এবং শরীরে চর্বি জমার সুযোগও হয় না। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিম রাখার চেষ্টা করুন তবে ভাজি বা পোচ ডিম নয়।

ডার্ক চকোলেটঃ 

ডার্ক চকোলেট

চকোলেট চর্বি কমাতে সাহায্য না করলেও ৭০ শতাংশের চেয়ে বেশি কোকোয়া সমৃদ্ধ ডার্ক চকোলেট চর্বি কমিয়ে থাকে। যার ফলে উচ্চ মাত্রায় এন্টিঅক্সিডেন্ট পলিফেনল পাওয়া যায়। এতে উপস্থিত বাটিরেইট নামক ফ্যাটি এসিড শরীরে চর্বি পুড়িয়ে ওজন কমাতে সাহায্য করে থাকে।

পানিঃ

পানি

আমরা সবাই মেদ কমানোর জন্য নানা রকম খাবার খাই, কিন্তু হাতের কাছেই যে উপাদানটি আমাদেরকে অনেক বেশি সাহায্য করে মেদ কমাতে সেদিকে আমরা সাধারণত খেয়ালই করি না। সেই উপাদানটি হচ্ছে পানি। শুনতে অবাক লাগলেও পানি আপনার দেহের চর্বি কমাতে উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে।

শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে পানির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ধারণা করা হয়ে থাকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করলে সেটি আপনার ওজন কমাতে সরাসরি কাজ করে থাকে। পানি শরীরকে সতেজ রাখে এবং অযথা ক্ষুধাভাব থেকে দূরে রাখে।সঠিক পরিমাণে পানি পান করার ফলে শরীরের মেটাবলিজম রেট বৃদ্ধি পায়।যার ফলে শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বি জমতে পারে না।

এছাড়াও যাদের স্ট্রেস ইটিং বা ইমোশনাল ইটিং (কোনকিছু নিয়ে চিন্তা করলে বা কষ্ট পেলে বেশি বেশি খাওয়া)এর সমস্যা আছে,তারা সেই সময় অন্য কিছু খাওয়ার পরিবর্তে পানি খেতে পারেন,যার ফলে আপনার ক্ষুধাভাবও কমে যাবে,অযথা চর্বিও জমবে না আপনার শরীরে।

চর্বি কমানোর কিছু টিপসঃ

★একেবারে বেশি করে খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খাবেন।চেষ্টা করবেন ২-৩ ঘণ্টা পর পর খেতে।

★চিনি এবং ময়দা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন।

★অতিরিক্ত তেল,ঘি দেয়া খাবার,বিভিন্ন ফাস্টফুড জাতীর খাবার একেবারেই খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিবেন।

★খাবারের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখবেন।

★চেষ্টা করবেন ছোট প্লেটে খাবার খেতে এবং বারবার না নিয়ে একবারেই প্রয়োজনীয় খাবার প্লেটে নিয়ে নিতে।

★চর্বি কমাতে খাবারের পাশাপাশি যথেষ্ট  পরিমাণে ঘুমেরও দরকার আছে।ঘুম ঠিকমতো না হলেও অনেক সময় ওজন বেড়ে যায়।

★সুস্থ থাকতে নিয়মিত ব্যায়াম অথবা হাটাহাটি করার অভ্যাস থাকা ভালো।

শেষ কথাঃ

উপরে বর্ণিত চর্বি কমাতে সাহায্যকারী ১০টি খাবার খেয়ে খুব সহজেই চর্বি কমিয়ে নিজেকে ফিট এবং আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। তবে সবসময় এটা মনে রাখতে হবে,চর্বি কমানোর জন্য খাবারে অনিয়ম করে নিজেকে অসুস্থ করে ফেলা যাবে না। নিয়ম মেনে সময় নিয়ে চেষ্টা করলে সহজেই অতিরিক্ত চর্বি ঝরিয়ে নিজেকে ফিট করে গড়ে তোলা যায়।

Explore More:

আপনার স্বাস্থ্য রক্ষায় ১০ টি উপাদান যুক্ত খাদ্য তালিকার নাম

Recent Posts