মিষ্টির জন্য বিখ্যাত যে সব জেলা


আমরা বাঙালীরা স্বভাবতই ভোজনরসিক। আমরা যেমন নানান রকম মুখরোচক খাবার খেতে পছন্দ করি। তেমনি খাবারের সাথে মিষ্টিমুখের জন্য কিছু না কিছু চাই ই চাই। আবার বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজনে মিষ্টি ছাড়া যেন জমেই না। আবার কোন আনন্দের সংবাদে মিষ্টিমুখ করে আনন্দ ভাগাভাগি করা।

অতিথি আপ্যায়নেও মিষ্টির তুলনা অপরিসীম। বিভিন্ন কারণে অকারণে মিষ্টি আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ,ভালো সময়ের সঙী এবং সাক্ষী হয়ে রয়েছে। একেক প্রকার মিষ্টি একেক জেলার নামে প্রসিদ্ধ। তাহলে জেনে নেয়া যাক কোন কোন জেলার কি কি মিষ্টি জনপ্রিয় –

১. বগুড়ার দইঃ

উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বগুড়ার দই সবচেয়ে বিখ্যাত । দই দুধের ব্যাকটেরিয়া গাঁজন থেকে তৈরি করা হয়। বগুড়ার দইয়ের উৎপত্তি মূলত শেরপুর উপজেলা থেকে। জানা গেছে দই তৈরি শুরু হয় শেরপুর উপজেলায় প্রায় আড়াইশ বছর আগে। স্থানীয়দের মতে দই প্রথম তৈরি করা শুরু করে সনাতন ঘোষ সম্প্রদায় এবং অনেক জনপ্রিয়তা পায়।

কিভাবে জনপ্রিয়তা পায় দই –

 তৎকালীন ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই বানানো শুরু করে। এরপর কালক্রমে মুসলিম সম্প্রদায় সহ নানা প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে যায়। সামান্য দুধ,চিনির সংমিশ্রণে তৈরি অসাধারণ এই মিষ্টান্ন সেই ব্রিটিশ আমল থেকে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এমনকি ষাটের দশকের প্রথমে রাণী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে মার্কিন মুল্লুকেও এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

বগুড়ায় গেলেন কিন্তু দই খাবেননা এটা ভাবা ও যায় না। দই সাধারণত কয়েক পদের হয়ে থাকে।

দাম-একেক পদের দাম একেক রকম। সরার দই ১৬০ টাকা,সাধারণ গুলো ৯০-১১০ টাকা,সাদা দই ১০০ টাকা পিস করে বিক্রি হয়।

২. নওগাঁর প্যারা সন্দেশঃ

 জেলার মধ্যে প্যারা সন্দেশের জনপ্রিয়তা অনেক। বিভিন্ন জেলায় পাওয়া গেলেও প্যারা সন্দেশের উৎপত্তি নওগাঁ থেকেই। এটি মূলত আগে দেব-দেবীর উপানার জন্যই বানানো হত।কালক্রমে এই সন্দেশের অসাধারণ স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে সন্দেশটির  মিষ্টান্ন হিসেবে জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে মহেন্দ্রী দাস নামের এক ব্যক্তি নওগাঁ জেলার কালিতলা এলাকায় প্রথম সন্দেশ বানানো শুরু করেন।

প্যারা সন্দেশ কিভাবে খ্যাতি ছড়ায় –

মহেন্দ্রী দাস ভারতের বিহারের এক নবাবের অধীনে মিষ্টি তৈরির কাজ করতেন। কিন্তু পরে সেই নবাব কোন এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নিহত হন।তখন উনি জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসেন।নওগাঁয় এসে প্যারা সন্দেশ বানানো শুরু করেন। সেই প্যারা সন্দেশ তিনি বিভিন্ন মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বিক্রি করা শুরু করেন।

 এরপর কলকাতার এক মন্দিরের পাশে প্যারা সন্দেশের দোকান দেন ‘মা নওগাঁর প্যারা সন্দেশ’ নামে। তখন তেমন জনবসতি ছিল না। তাই তেমন খ্যাতি তখনও ছড়ায়নি।মহেন্দ্রী দাস এর পরে তার ছেলে ধীরেন্দ্র দাস সেই দোকানের দায়িত্ব নেন। এরপর ধীরেন্দ্র দাস বিমল মহন্ত নামের এক মিষ্টির দোকানের কারিগরকে তার দোকানে নিয়োগ দেন।

 উনার হাত ধরে প্যারা সন্দেশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।প্রায় ৩০ বছর ধীরেন্দ্র মিষ্টির এই ব্যবসা চালিয়ে যান। এরপর সুরেশচন্দ্র মহন্দ্রের কাছে দোকান বিক্রি করে দেন। সুরেশচন্দ্র পরে নতুন মিষ্টির কারিগর নারায়ণ চন্দ্রকে নিয়োগ দেন। এরপর আবার দোকানের মালিকানা পরিবর্তন হয়।

 বর্তমানে বৈদ্য রতন দাস দোকানের মালিক।কারিগর এখনও নারায়ণ চন্দ্র দাস রয়েছেন। এখন মা নওগাঁর প্যারা সন্দেশ ছাড়াও আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্যারা সন্দেশ তৈরি করে।

দাম-এই সন্দেশ ৩০০ টাকা কেজি হয়ে থাকে। প্রতি কেজিতা ৭৫-৮০ পিস হয়।

৩. নাটোরের কাঁচাগোল্লাঃ

 নাটোরের কাঁচাগোল্লার খ্যাতি রাণী ভবানির আমলেই অর্থ্যাৎ ২৫০ বছর আগেই দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে পড়ে। লোকমতে নাটোর শহরের লালবাজারে মধুসূদন পালের মিষ্টির দোকান ছিল। সেখানে নানান পদের মজাদার মিষ্টি পাওয়া যেত। মিষ্টি তৈরির মূল উপাদান মূলত দুধের ছানা। তাই মিষ্টি তৈরির জন্য প্রতিদিন ছানা লাগত। সেই ছানা দিয়ে পানতোয়া,কালজাম,চমচম তৈরি হত।

কাঁচাগোল্লার উৎপত্তির কাহিনী –

রাণী ভবানীর মিষ্টি খুব পছন্দের ছিল। তাই মধুসূদন পালের কাছ থেকে মিষ্টি নিয়মিত নিতেন।কিন্তু একদিন মধুসূদন পালের প্রায় সব কারিগর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন দোকানে দু মণ ছানা ছিল। তিনি চিন্তায় পড়ে যান ছানা নিয়ে। তখন তিনি চিনির সিরায় ছানা ভিজিয়ে দিয়ে জ্বাল দিয়ে নামিয়ে রাখেন। এরপর চেখে দেখেন অসাধারণ স্বাদ হয়েছে। তখন রাণীর লোক এলে ছানাটি পাঠিয়ে দেন। রাণীর খুব পছন্দ হয়। নাম জিজ্ঞাসা করলে মধুসূদন পড়েন বিপাকে।

 যেহেতু ছানা আগে ভাজা হয়নি,কাঁচা ছানায় সিরা মিশানো হয়েছে তাই তিনি নাম দিলেন কাঁচাগোল্লা। এরপর থেকে দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়তে থাকে এবং মধুসূদন এর কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

দাম-সে সময় প্রতি সের কাঁচাগোল্লার দাম ছিল ৩ আনা।বর্তমানে প্রতি কেজির মূল্য ৩০০-৩৫০ টাকা

৪. টাংগাইলের পোড়াবাড়ির চমচমঃ

 চমচমকে  বাংলাদেশের মিষ্টির রাজা বলা হয়। চমচম বাংলাদেশ সহ ভারত,পাকিস্তানে ছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশে  বিখ্যাত। চমচমের উৎপত্তি টাংগাইলের পোড়াবাড়ি নামক জাগায়।

প্রায় দু’শ বছর আগে যশোরথ নামে এক কারিগর এই চমচম মিষ্টি তৈরি করা শুরু করেন। সম্যের সাথে সাথে এই মিষ্টির স্বাদ বৈশিষ্ট্য এখনো বজায় আছে। পোড়াবাড়ি গ্রামের বাইরে পাঁচআনিসহ কয়েকটি এলাকার কারিগর এই মিষ্টি বানাতে পারে। এর স্বাদ এমনই যা মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। এই স্বাদ নিতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোজনরসিকরা যায়।

দাম-এই চমচমের দাম মাত্র ২০০ টাকা কেজি। প্রতি কেজিতে ১৭-১৮ পিস হয়।

৫. কুমিল্লার রসমালাইঃ

রসমালাইর পছন্দ না এমন মানুষ আছে বলে আমার জানা নেই। তবে যারা মিষ্টি খেতে ভালবাসেন তাদের ভাল লাগালিস্টে রসমালাই অবশ্যই থাকবে। বাংলাদেশের মধ্যে কুমিল্লার রসমালাই। জানা গেছে ১৯০০ সালে প্রথম রসমালাই তৈরি শুরু হয়। ১৯৩০ সালে কুমিল্লা মাতৃভান্ডার রসমালাই বানিয়ে নাম করে। মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত সংকর সেনের হাত ধরে এর বিকাশ ঘটে। বর্তমানে ছেলে অনির্বাণ সেনগুপ্ত ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

দাম-কুমিল্লার মজাদার রসমালাই ২৬০ টাকা কেজি করে বিক্রি হয়।

৬.নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টিঃ

বালিশ মিষ্টি নেত্রকোনার মধ্যে অনেক জনপ্রিয়। বালিশ মিষ্টি আকারে বালিশের মত বড় না হলেও দেখতে অনেকটা বালিশের মত। এই বালিশ মিষ্টির জনক গয়ানাথ ঘোষ। এই জন্য এই মিষ্টি  গয়নাথ বালিশ নামেও খ্যাতি পায়। হিন্দুদের মধ্যে ঘোষ পরিবার মিষ্টি তৈরিতে বিখ্যাত।

বালিশ মিষ্টির উৎপত্তি –

 ‘গয়নাথ মিষ্টি ভান্ডার’ এর স্বত্বাধিকারী গয়নাথের স্বপ্ন ছিল নতুন কোন মিষ্টি উদ্ভাবন করার। তিনি একদিন বিশাল বালিশ আকারের মিষ্টি বানান এবং ক্রেতাদের খেতে দেন। ক্রেতারা খেয়ে অনেক প্রসংশা করেন। এরপর ক্রেতাদের পরামর্শে তিনি মিষ্টির নাম বালিশ মিষ্টি দেন। অসাধারণ স্বাদ এর জন্য অনেক তাড়াতাড়ি এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। আগে শুধু গয়নাথের দোকানেই শুধু পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অন্যান্য জাগায়ও বালিশ মিষ্টি বিক্রি হয়। এই মিষ্টি পিস হিসেবে বিক্রি হয়। আকার অনুযায়ী দাম এ ভিন্নতা আছে।২০,৫০,১০০ টাকা পিস পাওয়া যায়।

দাম-২০০টাকা পিস ও পাওয়া যায় যা আকারে ১৩-১৪ ইঞ্চি হয়।

৭. মেহেরপুরের সাবিত্রীঃ

সাবিত্রী বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে অনেক বিখ্যাত।দুধের সর দিয়ে এই মিষ্টি তৈরি হয়। অন্যান্য মিষ্টির মত দেখতে রসাল না হলেও ভিতরে রসাল। এটার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এটা স্বাভাবিক তাপমাত্রা অনেকদিন ভাল থাকে। এই মিষ্টির উদ্ভাবন প্রায় দেড় শত বছর আগে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ শাসনের সময়।

জনৈক বাসুদেব সাবিত্রী তৈরি শুরু করেন। সে অঞ্চলের জমিদার সুরেন বোসের জমিদার বাড়ির ফটকের সামনে বাসুদেবের দোকান থাকায় জমিদার বাড়ির অতিথিদের সাবিত্রী দিয়ে আপ্যায়ন করা হত।

দাম-প্রতি কেজি সাবিত্রী ৩০০টাকা করে বিক্রি হয় ।

৮. ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মন্ডাঃ

ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার মধ্যে বিখ্যাত মিষ্টি মুক্তাগাছার মন্ডা। এই মিষ্টি   বানান রাম গোপাল পাল। ১৮২৪ খ্রিঃ রাম গোপাল পাল মুক্তাগাছার জমিদারদের মধ্যে একজন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে পেশ করেন। তখন বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হত সে সব আয়োজনে এই মন্ডা পেশ করা হত। বর্তমানে রাম গোপাল পাল এর পঞ্চম বংশধর এই ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন।

দাম- এই মন্ডার দাম ৫০০-৬০০ টাকা কেজি করে বিক্রি হয়।

৯. যশোরের জামতলার মিষ্টিঃ

 যশোর জেলার মধ্যে জামতলার মিষ্টি অনেক বিখ্যাত। এই মিষ্টি জামতলা বাজারের সাদেক আলী নামে এক ব্যক্তি তৈরি শুরু করেন। সাদেক আলী একজন চায়ের দোকামদার ছিলেন। তার দোকানে চায়ের জন্য গোয়ালা নিয়মিত দুধ দিয়ে যেত। একদিন দুধের পরিনাণ বেশি হওয়ায় সাদেককে দুধ রেখে দিতে বলে। সাদেক রাজি হয়নি।

তখন কুমিল্লার এক ব্যক্তি দুধের মান ভাল হওয়ার রেখে দিতে বলেন এবং আরো বললেন বাকি দুধ দিয়ে রাতে মিষ্টি তৈরি করে দিবেন। পরে সাদেক উনার বলে দেয়া পদ্ধতিতে মিষ্টি তৈরি শুরু করেন। এর স্বাদ ও গুনের জন্য এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রসগোল্লা তৈরির মত তাই এই মিষ্টি কে জামতলার রসগোল্লা ও বলা হয়।

দাম-এই মিষ্টি প্রতি পিস ৫-১০ টাকা করে বিক্রি হয়।

১০. গাইবান্ধার রসমঞ্জুরীঃ

 রসমঞ্জুরী গাইবান্ধার মধ্যে বিখ্যাত মিষ্টি। এই মিষ্টি দুধ,ছানা,ক্ষীর দিয়ে বানানো হয় । ঘন রস এর কারণে এই মিষ্টির নাম রসমঞ্জুরী। রসমালাই এর মত দেখতে হলেও এর স্বাদ অন্যরকম মজাদার। এই মিষ্টি রমেশ ঘোষ এর হাত ধরেই শুরু। ১৯৪৮ সালে রমেশ ঘোষ এক কারিগর কে নিয়ে এই মিষ্টি বানানো শুরু করেন। এখনও রমেশ ঘোষ এর দোকান তার স্বজনরাই চালিয়ে আসছে।

দাম-এই মিষ্টি প্রতি কেজি ২৮০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে।

দেশে নানা প্রকার মজার মজার মিষ্টি পাওয়া যায়। একেকটার স্বাদ একেক রকম অসাধারণ অতুলনীয়। একেকটা মিষ্টি একেকটা জেলার ঐতিহ্য বহন করে আসছে। প্রতিটি মিষ্টির আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য,স্বাদ,গুণের জন্য আলাদা আলাদা খ্যাতি রয়েছে। তারই মধ্যে মিষ্টির জন্য বিখ্যাত কিছু জেলা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

লেখকঃআনিকা তাবাসসুম শ্রেয়া

Recent Posts