বিশ্বের সেরা ১০ দুঃসাহসী প্রাণী


পৃথিবীতে যে কত প্রাণী আছ তার সঠিক সংখ্যাটা কেউই হয়ত বলতে পারবেনা। এ প্রাণীজগত বড়ই রহস্যময়। মানুষের আগ্রহের শেষ নেই এ জগত নিয়ে। এদের মধ্যে আবার কতক বৃহৎ কতক আবার অতিকায় ক্ষুদ্র। তবে সাহস কিন্ত বড় ছোট আকার দেখে হয় না।

প্রকৃতিগত স্বভাবের জন্য কিছু প্রাণীর জীবন সত্যি আমাদের কাছে অনেক আগ্রহের।আজকের লেখার মুল বিষয় বিশ্বের সেরা ১০ দুঃসাহসী প্রাণী নিয়ে বিভিন্ন তথ্য দিব। 

বিশ্বের সেরা ১০ দুঃসাহসী প্রাণী

১)বাঘঃ

বাঘ
বাঘ

বাঘ আমাদের কাছে একটি অতিপরিচিত প্রাণী। যদিও এ প্রাণিটা হিংস্র ও মাংসাশী  তবুও কোন প্রাণীর নাম বলতে বললে বাঘের কথাই আগে মনে আসবে। এর কারণ এ প্রাণীটা এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। দ্রুতগতি,শক্তির জন্য আমরা বাঘকে অন্য প্রাণীর চেয়ে এগিয়ে রাখি। প্রাণীকুলের মধ্যে জনপ্রিয়তায় শীর্ষস্হান হল বাঘের।

আমাদের কাছে বাঘ বেশি পরিচিত কারণ আমাদের জাতীয় প্রানী এ বাঘ। সতর্কতা,বুদ্ধি মত্তা,শক্তিও ধৈর্য্যের জন্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার জাতীয় পশুর স্বীকৃতি পেয়েছে।। বাঘের দুঃসাহসিক স্বভাবের জন্য আমাদের দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতীকেও বাঘের ছবি ব্যবহার করা হয়। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জাতীয় প্রানীও বাঘ। 

বাঘের ৮ টি প্রজাতি রয়েছে। আর সে প্রজাতির মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ ও ভারতের একটি বিশেষ প্রজাতির বাঘ যেটিকে এ দুদেশে জাতীয় প্রাণীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পৃথিবীতে অনেক প্রজাতির বাঘ রয়েছে যেগুলোর আকৃতি, রং,আচরণ, খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে একেকটি থেকে ভিন্ন। 

রয়েল বেঙ্গল টাইগার আকারে অন্যান্য প্রজাতির বাঘের চেয়ে আকারে বড় ও অধিক গতিসম্পন্ন, হিংস্র প্রাণী। বাঘ সাধারণত মাংশাসী হয়।তবে ইন্দো চীনের কিছু নিরামিষভোজী বাঘ আছে।

বাঘ বনের অন্্যান্য প্রাণীকে খেয়ে সাবাড় করে ঠিক তবে সেটাও প্রকৃতির বিয়ম মেনে। যার ফলে বাঘের হাতে বিভিন্ন প্রাণী শিকার হলেও প্রাণীর ভারসাম্য নষ্ট হয় না।

উল্টো বাঘের সংখ্যাই দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই এ প্রাণীটি সংরক্ষণ করা দরকার।

২)সিংহঃ 

সিংহ
সিংহ

সারাবিশ্বে সিংহকে সবাই চেনে পশুরাজ হিসেবে।।কারণ সিংহ শুধু অতিকায় পশুই নয় সেই সাথে বীরত্ব,সাহসিকতা আর নেতৃত্বের প্রতীক।

বর্তমানে পৃথিবীতে সিংহের দুটো প্রজাতি রয়েছে। ১) আফ্রিকান সিংহ ২) এশিয় সিংহ।

সিংহ প্যানথেরা পরিবারের প্রানী। সাথে এটি বিড়াল গোত্রের অন্তর্ভুক্ত সবচেয়ে বড় প্রাণী। বিড়াল গোত্রের যত প্রানী আছে তার মধ্যে সিংহের গর্জন সবচেয়ে জোরালো। ৫ মাইল দূর থেকেও শোনা যেতে পারে এর গর্জন। 

ঘণ্টায় ৫০মাইল গতিতে দৌড়াতে পারে সিংহ যে কারণে এটি দ্বিতীয় দ্রুততম বন্যপ্রানী। সিংহের লেজের শেষ মাথায় চুলের গোছার মত পশম ঝুলন্ত আছে। এই পশমওয়ালা লেজের মাধ্যমে সিংহ অন্যান্য প্রানীর সাথে যোগাযোগ করে থাকে। এটির মাধ্যমে সে অন্য প্রানীদের আদেশ, নির্দেশ দেয় এবং আদরও প্রকাশ করে।

১টি সিংহ গড়ে ১৩ বছর বাঁচে। তবে অনেক সিংহ ৩০ বছরের কাছাকাছি বাঁচতে পারে। খাঁচায় যে সিংহগুলো থাকে সেগুলোর গড় আয়ু বনপর সিংহের চেয়ে বেশি হয়। কারণ খাঁচায় সিংহকে শক্তির অপচয় করতে হয় কম।

সিংহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর কেশর। পুরুষ সিংহেরই কেশর থাকে। ৫-৮ফুট পর্যন্ত এই কেশর লম্বা হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে কেশরের রংও গাঢ় হয়।কালো কেশরের পুরুষ  সিংহের প্রতি নারী সিংহের বেশি আকর্ষণ থাকে।

সিংহ মাংসাশী প্রাণী। পুরুষ সিংহ একদিনে ৪০ কেজি পর্যন্ত মাংস খেতে পারে আর সিংহী পারে ২৫ কেজি পর্যন্ত। তবে এটা হল সর্বোচ্চ পরিমাণ।সাধারণত ৫-৭কেজি মাংস খায় সিংহ। বিভিন্ন জাতের হরিণ, জেব্রা, বুনো মহিষ, জিরাফ, শুকর ইত্যাদি বন্যপ্রানী এদের প্রধান খাদ্য।

একটি পুরুষ সিংহের ওজন ১৫০-২৫০কেজি পর্যন্ত হয়। আর নারী সিংহ  ১২০-১৮২ কেজির মত হতে পারে।

সিংহ কিন্তু জন্মের ২ সপ্তাহ পরে ভালোকরে দৃষ্টিশক্তি লাভ করে। এর আগ পর্যন্ত এরা অন্ধ থাকে। সিংহের নির্দিষ্ট বাসা নেই, তবে পালানোর জন্য এদের গোপন জায়গা থাকে। তবে অন্য দলের সিংহদের কাছপ এটি প্রকাশ হলে তারা সে জায়গা বদলে ফেলে।

সিংহ প্রায় ১ মিলিয়ন বছরের আগে থেকে আফ্রিকায় ছিল। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকার উপ-সাহারান অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সিলহ রয়েছে। বাকিগুলো এশিয়া তথা ভারতে আছে।

অসম তেজ,ক্ষিপ্রতা আর সুন্দর কেশরের জন্য সিংহকে ব্রিটিশরা তাদের জাতীয় পশুর স্থান দিয়েছে। আসলে সিংহের এসব বৈশিষ্ট্যের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পণ্যের লোগো, বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে থাকে।

তবে সিংহ আজ বিপন্ন প্রাণীর তালিকায়। গোপনে শিকার হওয়া, জনসংখ্যার আধিক্যের জন্য বন তথা সিংহের আবাসস্থল ধ্বংস, খাবার সংকট প্রভৃতি কারনে সিংহের সংখ্যা লুপ্ত হচ্ছে। তাই আমাদের উচিত সিংহকে সংরক্ষণ করা ও এজন্য কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা।

৩) নীলতিমিঃ 

নীল তিমি
নীল তিমি

পৃথিবীর আরেকটি দুঃসাহসিক প্রাণী হল নীল তিমি। আমরা আপাত দৃষ্টিতে এটিকে মাছ বলে থাকি। কিন্তু মাছের মত দেখতে হলেও জলজ এ প্রানীটা আসলে মাছ নয়।

নীল তিমি হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর ব্যাপারে জানতে মানুষ সবসময় আগ্রহী। কারণ এর বৈশিষ্ট্য, আকার, জীবন মানুষকে আকৃষ্ট করে।

তিমি প্রাণী টির মধ্যে মাছের কোন স্বভাবই বিদ্যমান নয়। নানারকম তিমি রয়েছে সাগরে। এগুলোর নামঃ কিলার তিমি, নীল তিমি, পাইলট তিমি, ফিন তিমি, গ্রে তিমি ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত আর বড় হচ্ছে নীল তিমি।

একটি তিমির ওজন প্রায় ২০০টনের মত। অথবা ৪০ টি হাতির ওজনের সমান। এদের জিভের ওজন নাকি ১টা হাতির সমান। আর এত লম্বা ও চওড়া যে ১টা ফুটবল টীম দাঁড়াতে পারবে।  আর নীল তিমির হৃদপিণ্ড প্রাইভেট ছোট খাটো গাড়ির ওজনের সমান। নীল তিমির রং পানির নিচে নীল দেখালেও পানির উপরে ভেসে উঠলে শরীরে নীলাভ ধূসর রং এর ছোপ দেখা যায়।

নীল তিমি চিংড়ির মত দেখতে “ক্রিল” নামক একধরণের মাছ খেয়ে জীবনধারণ করে। তবে এ “ক্রিল” কিন্তু দু একটা খায় তা নয়, এটার সংখ্যা ৪০মিলিয়নের মত। সারা দিনে নীল তিমি ৪ টনের মত খাবার খেতে পারে।

নীল তিমির কিন্তু দাঁত নেই। এর বদলে আছে ঝালরের ন্যয় ব্যলিন যা ফিল্টারের কাজ করে। কোন খাবার খাওয়ার সময় যখন মুখে পানি ঢুকে যায় তখন পানিটা ফেলে দেয় আর ব্যলিনে আটকে রাখে খাবার। নীল তিমির মুখের ভেতর ৩ ফুটেরও বেশি লম্বা ব্যলিনের সংখ্যা ৩০০ টি।

নীল তিমি দলবেঁধে না ঘুরে একাই ঘুরতে বেশি পছন্দ করে। ঘণ্টায় ৫মাইল পর্যন্ত সাঁতার কাটে এরা। তবে ক্ষেপে গেলে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২০মাইল পর্যন্ত। নীল তিমি কিন্তু পানিতে থাকলেও শব্দ করতে পারে অনেক জোরে। যার তীব্রতা প্রায় ১৮৮ডেসিবেলের কাছে। ১০০০ মাইল দূর থেকে এক তিমি আরেক তিমির শব্দ শুনতে পায়।

একটি নীল তিমির গড় বয়স ৮০-৯০ বছর। সর্বোচ্চ ১১০বছর বয়সী নীল তিমি পাওয়া গেছে।পৃথিবীর সব মহাসাগর যেমন এ্যান্টার্কটিকা, প্রশান্ত, আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে রয়েছে নীল তিমির উপস্থিতি। 

নীল তিমি গ্রীষ্মে খাবার গ্রহণ করে শীতে ও প্রজননের সময় শক্তি জমা রাখে। শীতে এরা খুব কম খাবার খায়। এসময় শরীরে পুরু চর্বির স্তর তৈরি হয়। শীতের প্রকোপ যেখানে বেশি হয় সেখান থেকে প্রজননের জন্য সঙ্গী খুজতে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জায়গায় চলে আসে এরা। সন্তান জন্মের সময় শীত থাকলে ঠাণ্ডা পানিতে মৃত্যু হতে পারে তাই এ নিয়ম নীল তিমির।

নীল তিমি প্রায় ১ বছর গর্ভধারণ করে সন্তান জন্ম দেয় যার ওজনও ৩ টনের কাছে। আর লম্বা ২৫ ফুট। আর বাচ্চার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকে  ৫০০ লিটার দুধ। ২/৩ বছর পরপর এরা সন্তান জন্ম দেয়।

নীল তিমির সবচেয়ে মজার বিষয় হল পানিতে থাকলেও শ্বাস নেয়ার জন্য পানির বাইরে আসতে হয় ৩০মিনিট পরপর। এ কারণেই তিমি কখনও পুরোপুরি ঘুমায়না কখনই। যদি পুরো ঘুমিয়ে যায় তখন শ্বাস না নিতে পেরে মারা যায় সে জন্য এ আচরণ তাদের।

নীল তিমি কিন্তু আজ বিপন্ন প্রাণীর তালিকায়। কারণ এর শরীরে বিপুল পরিমাণ চর্বি আছে যা মানুষ তাদের জ্বালানি সহ বিভিন্ন কাজে লাগায়। এজন্য নীল তিমি শিকার করা হয় প্রচুর। যদিও আইনত নিষিদ্ধ তবুও থেমে নেই এ অন্যায়।

৪)সাপঃ

 

সাপ
সাপ

সাপ হল মানুষের কাছে ভয়ঙ্কর প্রাণীর আরেক নাম। যদিও সব সাপ ভয়ংকর নয়। তবুও এর কার্যকলাপ,আকার,চলাচলের জন্য একে সবাই ভয় পায়।

সাপ এমন একটি সরীসৃপ প্রাণী যার কোন হাত পা নেই। ফিতার মত লম্বা শরীরে মাথা ও লেজই মূলত দৃশ্যমান। মাথার অংশে আছে একজোড়া চোখ,মুখের ভেতর আছে জিহ্বা যা দুইভাগে বিভক্ত। এ জিহ্বা দিয়ে সাপ শুনতে পায় শব্দ ফলে এর কোন বাহ্যিক কান নেই।শরীর আবৃত আছে আঁশ দিয়ে।

সাপ সাগর,মহাসাগর, স্থল,বন, জঙ্গল সবখানেই বিচরণ করে। সাপের যে জিনিসে মানুষের সবচেয়ে বেশি ভয় তাহল এর বিষ।সাপের দাঁতে থাকে এ বিষ।তবে খুব কম সংখ্যক সাপেই বিষ আছে। বেশির ভাগ সাপ বিষহীন। 

সাপ অনেকাংশে মাংসাশী হলেও দুধও খেতে পারে কিছু কিছু। তবে সাপ মানুষ শিকার করেনা যদি না কোন মানুষ তাকে আক্রমণ করে বা আঘাত করে।

সাপের ২৯০০ টিরও বেশি প্রজাতি আছে। এন্টার্কটিকা মহাদেশ বাদে সব মহাদেশেই সাপ আছে। কোন কোন সাপ খুব ছোট হয় যারা লম্বায় ১০সে.মি.পর্যন্ত হয়। আবার কোন কোন সাপ ২৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। যেমন ঃঅজগর,এ্যানাকোন্ডা।

 সাপের বিষ যেমন মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর জীবনের জন্য ঝুকিপূর্ণ তেমনি এ বিষ আবার মানুষের জীবন বাঁচাতেও অনেক কাজে লাগে। বিভিন্ন রোগের ঔষধ তৈরিতে এ বিষ ব্যবহৃত হয়।

সাপও কিন্তু পোষা যায়। এর সবচেয়ে নিকটতম উদাহরণ হল আমাদের দেশের বেদে সমাজ। তারা সাপ ধরে বিশেষ উপায়ে বিষদাত অপসারণ করে একে পোষ মানিয়ে মানুষকে খেলা দেখায়। এর মাধ্যমে জীবীকা নির্বাহ করে তারা।

সাপ নিয়ে গবেষণা চালান যারা তাদেরকে বলতে হয় অনেক সাহসী। কারণ সাপ এমন প্রাণী যা ক্ষতিকর, ভয়ংকর আবার উপকারী। এর থেকে সুফল পেতে চাইলে সাপ নিয়ে জানতে হবে, সাহস রাখতে হবে সাপের কাছাকাছি এসে।

৫)হাতিঃ

 

হাতি
হাতি

হাতি হল পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণী। হাতির শরীরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর শুঁড় যেটাকে হাতের মত কাজে লাগায়। তাই এর নাম হাতি।

হাতি ৩ প্রজাতির। ২ধরনের হল আফ্রিকান আর ১ ধরণের হল এশিয় প্রজাতি। এশিয় হাতি ৪০০০কেজি পর্যন্ত হয়। আর আফ্রিকান হাতি ২৭০০-৬০০০ কেজি হয়ে থাকে। এশিয় হাতি দৈর্ঘ্যে ৫.৫-৬.৫ মিটার হয়ে থাকে। যাদের গড় আয়ু ৪৮ বছর। আফ্রিকান হাতির গড় আয়ু ৬০-৭০  বছর।

হাতি দলবেঁধে থাকে সবসময়। প্রতিটি দলে ৫-১৫ টি হাতি থাকে। তাদের দলপতির দাঁত হয় সবচেয়ে লম্বা ও শক্তিশালী যেটা দিয়ে তাকে চেনা যায়। হাতির দুধ দাঁত ছ’বার ওঠে। খাবার চিবিয়ে এ দাঁত আবার দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। জীবনে শেষবার দাঁত ওঠার পর যখন তা ক্ষয়ে যায় তখন হাতি অনাহারে মারা যায়।

হাতিকে মনুষ্য সমাজে পোষ মানিয়ে অনেক কাজ করানো যায়। যুদ্ধে হাতির ব্যবহার আমরা আগেই দেখেছি। মানুষ তার কলাকৌশলের মাধ্যমে হাতিকে ভারি মালামাল টানতে, সার্কাসের মঞ্চে বিনোদনের উপায় হিসেবে, যাতায়াত ও আভিজাত্য প্রকাশে ব্যবহার করে আসছে।

বাঘ, সিংহ ছাড়া অন্য বন্য প্রাণীরা হাতিকে সমীহ করে চলে এর দুঃসাহস,বিশালাকার আর দানবীয় শক্তির জন্য।

নেতার মত দল পরিচালনা করতে বয়স্ক হাতি বেশ পছন্দ করে। তবে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই দলনেতা হতে হয়। অন্য পুরুষ হাতিদের সাথে লড়াইতে জিতে নিজেকে নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে হয়।

কচি বাঁশ, লতাপাতা, কলাগাছ, ঘাস ইত্যাদি তৃণ আর ফলমূল এদের প্রিয় খাবার। হাতি প্রতিদিন ১৪০ লিটার পানি আর ১৫০ কেজির মত খাবার খেয়ে থাকে। আর এত খাবারের কারণে দৈনিক মলমূত্রের ওজনও ১০০ কেজি হয়ে থাকে।

হাতির বিশাল ওজনকে অনেক সময় মনুষ্য সমাজে গালির উপমা হিসেবে ব্যবহার করে। মোটা মানুষকে হাতির মত দেখতে বা কোন মানুষের বেশি খাওয়া দেখলে হাতির মত খায় ইত্যাদি গালাগাল করা হয়।

তবে যাই হোক হাতি বিশাল এবং বন্য প্রাণী হলেও হাতিকে মানুষ পোষ মানানোর ফলে তাকে মানুষ তেমন ভয় পায়না বরং আদর করে। খেতে দেয় বা তাদের পিঠে চড়ে আনন্দ লাভ করে।

হাতির দাঁত অনেক মুল্যবান বস্তু হওয়ায় হাতি শিকার বেড়ে গেছে। চোরাকারবারিরা গোপনে হাতি শিকার করে যা রোধ করা না গেলে এ প্রিয় প্রাণীটিও পৃথিবী থেকে হয়ত বিদায় নিতে পারে কোন এক সময়।

৬)ঘোড়াঃ 

ঘোড়া
ঘোড়া

বক্রপদ খুড়ের অধিকারি এক দ্রুততম চতুষ্পদ প্রাণী হল ঘোড়া। যাকে দেখলে মানুষের মনে দৌড়ানো, যুদ্ধ এসবই মনে পড়ে।তবে ঘোড়া নিয়ে যুদ্ধে যাওয়া এখন হয়ত হয়না তবে তাকে নিয়ে খেলা চলে যা দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে থাকে মানুষ।

ঘোড়ারকথা মনে আসলেই দ্রুতগামী, দুঃসাহসী আর ক্ষিপ্রগতির কথা মনে আসে। যখন যানবাহন ছিলনা তখন মানুষের চলাচলের বাহন ছিল ঘোড়া। চিঠি বা কোন খবর পৌছাতে এই ঘোড়াকেই প্রাচীনকালে ব্যবহার করত মানুষ বহুলাংশে। ঘোড়ার পিঠে চড়া নিয়ে অনেক কাব্য, উপন্যাস, গল্প রয়েছে।

আগেকারদিনে ঘোড়াকে ভারবহনেও ব্যবহার করা হত। যদিও এখন আর সেসব হয়ত করা হয়না তবে আমাদের দেশে অনেক অঞ্চলে ঘোড়ার সাথে গাড়ি ও চাকা যুক্ত করে তাতে চড়ে মানুষ যাতায়াত করে ও অনেকক্ষেত্রে শৌখিনতা প্রকাশ করে।

ঘোড়া রাজকীয় ও অভিজাত প্রাণী যা আগেকার দিনের রাজা-বাদাশাহদের প্রধান বাহন ও যুদ্ধের অস্ত্র ছিল। এটিকে লালন পালন করা,পোষ মানানো অনেকটা গৃহপালিত পশুর ন্যয়ই করা হত।

ঘোড়ার ব্যাপারে একটি মজার তথ্য হল ঘোড়া দাঁড়িয়ে ঘুমায়।কারণ ঘোড়া তার পা ভাজ করতে পারেনা। তবে দাঁড়িয়ে থাকতে তার কোন সমস্যা হয় না।

পৃথিবীতে ৩৫০ প্রজাতির ঘোড়া আছে। এদের মধ্যে ক্যাবালাস কে পোষ মানানো হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ঘোড়া পাওয়া যায়।

৭)হাঙরঃ

হাঙর
হাঙর

 সেরা দশ দুঃসাহসী প্রাণীর তালিকায় এবার লিখব হাঙর মাছ নিয়ে। সাগরের বিপজ্জনক প্রাণীর মধ্যে হাঙর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর মানুষের জন্য।  সব সাগর মহাসাগরে এদের বাস।তবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও অর্ধ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এদেরকে বেশি থাকতে দেখা যায়।

হাঙরের অনেক ধরণের আকার আছে।কোন কোনটি ৯ইঞ্চি আবার কোনটি ৩৯ ফিট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রায় ২২৫ প্রজাতির হাঙর দেখা যায়।

হাঙর কিন্তু সাগরের বাস্তুসংস্থানে যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। কারণ এরা বড় বড় শিল মাছ ও শিকারি মাছ খায় যেগুলো আবার ছোট মাছ ও পোকা খেয়ে থাকে। আবার ছোট মাছ খায় জলজ গাছ ও শেওলা। হাঙর যদি না থাকে বা শিকারি মাছ ও শিল মাছ না খায় তবে এদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

হাঙরকে মানুষখেকো বা শিকারি মাছ হিসেবে মনে করা হলেও তারা মানুষকে ক্ষতি কমই করে। শুধুমাত্র ৩ প্রজাতির হাঙর মানুষকে জখম করে। যেগুলো আবার কৌতুহল বশত মানুষকে কামড়ায়!

তবে মানুষও কম যায়না। তারাও নির্বিচারে হাঙর হত্যা করে যাচ্ছে।হাঙরের লেজ দিয়ে স্যুপ বানানো হয় বলে শিকার করে লেজটুকু কেটে নেয় হাঙর শিকারিরা জেলের জালেও কিন্তু হাঙর ধরা পড়ে।

৮)কুকুরঃ 

কুকুর
কুকুর

দুঃসাহসিক প্রাণী বলতে বৃহৎ আকারের প্রাণীদের কথা মনে আসলেও অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এই চতুষ্পদ জন্তুটি কিন্তু সত্যিকার অর্থে সাহসী। যার কথা এ তালিকায় না তুললে তালিকাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

কুকুর প্রাণীটি প্রভুভক্ত ও গৃহপালিত প্রাণী। যদিও রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যাও অনেক। ১টি কুকুর  ১০-১৩ বছর পর্যন্ত বাঁচে। ৫৮-৬৮ দিন পর্যন্ত গর্ভধারণ করে। ১৫-১১০ সেমি পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। 

কুকুরের সবচেয়ে বেশি পরিচিত স্বভাব হল এর প্রভুভক্তি। এরা যার পোষ মানে তাকে জীবন দিয়ে হলেও বাঁচাতে চেষ্টা করে। মালিক কোন কাজ করলে খুশি হবে বা নারাজ হবে তাও বোঝার ক্ষমতা রাখে কুকুর।

তবে আমাদের দেশের গ্রাম বা মফস্বল শহরের বাড়িতে যেসব দেশি কুকুর পালন করা হয় সেগুলো মুলত চোর বা অচেনা লোক থেকে বাড়ি পাহাড়া দিতে কাজে লাগে। আর গোয়েন্দা বিভাগের অন্যতম সদস্য এ চারপেয়ে প্রাণীটা।

মানুষের চেয়ে কুকুরের ঘ্রাণ শক্তি অনেক গুন বেশি। কারণ আমাদের শ্বাসনালী আর ঘ্রাণ নেয়ার পথ একটাই। আর কুকুরের পৃথক পথ রয়েছে শ্বাস নেওয়া ও ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য। আররেকটা কারণ হল কুকুরের নাকের ডগা সবসময় ভেজা থাকায় ঘ্রাণ অনুগুলো নাকে আটকে দীর্ঘক্ষণ গন্ধ শুঁকে চিনতে সাহায্য করে। 

কুকুরের সাহসিকতা নিয়ে অনেক গল্প তৈরি হয়েছে। সম্মাননাও আছে অনেক কুকুরের জীবনে। এগুলো কিন্তু এ প্রানীটার ভালো কাজের ফল।

৯)ব্যাজারঃ 

ব্যাজার
ব্যাজার

এ প্রাণীটি আমাদের কাছে একটু অপরিচিতই বটে। ব্যাজার স্তন্যপায়ী ও আকৃতিতে ছোট একটা প্রাণী। গা লোমে ভরা এবং লোমগুলো সাদা, কালো, বাদামী, সোনালী রঙের হয়ে থাকে।

নিশাচর প্রাণী বলে এরা দিনে ঘুমায়। পায়ে শক্ত নখ আছে যা দিয়ে মাটিতে গর্ত করে খাবার সংগ্রহ করে। এদের শ্রবণশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি অনেক প্রখর। মানুষের উপস্থিতি টের পেলে দ্রুত পলায়ন করে।

সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করা এদের স্বভাব। একসাথে বসবাস করে এরা একটি অঞ্চল অধিকার করে থাকে। এদের দেহে লেজ আছ,মাথা ও চোখ রয়েছে। পুরুষ ব্যাজার নারী ব্যাজারের চেয়ে কিছুটা বড় হয়ে থাকে। এদের দৈর্ঘ্য ৭০-৭৫ সেমি হয়।

আবাসিক এলাকা, খোঁয়াড়, খোলা মাঠে সাধারণত এদের বাস। ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, রাশিয়া, চীন, সুইডেন, ইংল্যান্ড ও ভারতে এদের দেখতে পাওয়া যায়।

খাদ্য হিসেবে এরা খায় কেঁচো। আরও খায় ইঁদুর, শুয়োপোকা , টিকটিকি, পাখি, ডিম,খরগোশ, ব্যাঙ ইত্যাদি খেয়ে থাকে।

এটি খুব পরিচ্ছন্ন প্রাণী। এরা এদের বাসা মাটির নিচে গর্ত করে তৈরি করলেও বাসায় কোন খাবার ও মলত্যাগ করেনা।

ব্যাজারের দাঁত ও নখ ধারালো বিধায় মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এটিকে পোষা প্রাণী হিসেবে পালন করা হয়না। রাশিয়ায় ব্যাজারের মাংস খাওয়া হলেও অন্য কোথাও এটি খাওয়া হয় না।

১০)বাজপাখি ঃ

বাজপাখি
বাজপাখি

দুঃসাহসিক প্রাণীর তালিকায় শেষে বলব পাখির নাম। বাজপাখি নামে এ শিকারি পাখিটাকে আমরা সবাই কমবেশি চিনি। দ্রুততম পাখির খেতাবও এর ঝুলিতে। 

চোখা পাখা, চারকোনা লেজ ও খাঁজকাটা ঠোট এর দেহের বৈশিষ্ট্য। এদের গতি ক্ষিপ্র, উপর থেকে ছো মেরে শিকারকে ধরে।

মাঝারি আকারের ক্ষিপ্রতার প্রতীক এ শিকারি পাখিটি তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জন্য সবার কাছে পরিচিত। স্ত্রী বাজ পুরুষ বাজের চেয়ে বড় হয়।

এ পাখি শিকার  হিসেবে বিড়াল, খরগোশ, মুরগী, মাছ, ইঁদুর  ধরে খায়।তবে অন্য ছোট পাখিও কিন্তু বাজপাখির শিকারে পরিণত হয়।

মধ্য আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি বাজপাখির বাস।তবে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশেও এটি দেখা যায়।

বাজপাখির জীবন থেকে কিন্তু আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। একটি বাজপাখি ৭০বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। তবে ৪০ এর কোঠায় আসলে বাজপাখির ঠোঁট বাকা হয়ে যায়, নখ নরম হয়ে যায়, ডানা ভারী হয়ে যায়। ফলে ভালো করে উড়তেও পারেনা। ঠোঁট বাঁকা হওয়ায় খাবারও খেতে পারেনা ভালো করে। নখ নরম হওয়ায় থাবায় শিকারও ধরা পড়েনা আগের মত। তাই বাজ পাখি তখন ৩ টি কাজ করতে পারে। 

)আত্মহত্যা করতে পারে

)শকুনের মত মৃতদেহ খেতে পারে

) নিজেকে পুনরায় ফিরে পাওয়া।

৩ নম্বর টাই সে চেষ্টা করে আর এজন্য উঁচু পাহাড়ে উঠে ১৫০ দিন সময় নিয়ে নিজের বাকা ঠোঁট ও নরম নখ পাথরের আঘাতে ভেঙে ফেলে নতুন ঠোঁট ও নখ গজানোর আশায়। যখন গজায় এরপরে আরেক কষ্ট হল নিজের সব পালক ছিড়ে নতুন পালকের অপেক্ষা করে। এই ১৫০ দিনে সে নবরূপ লাভ করে বাকী জীবন আবার দাপট ও শক্তির সাথে পার করে।

শেষ কথাঃ

আজকে বিশ্বের সেরা ১০ দুঃসাহসী প্রাণী পরিচয় জানলাম যেখানে তাদের ব্যাপারে অনেক তথ্য পেলাম যা আগে জানা হয় নি। এসব প্রাণীর কেউ জলে, কেউ স্হলে আবার কেউ আকাশে স্ব স্ব পরিচয়ে বিচরণ করছে পৃথিবীতে। এদের সাহস, হিংস্রতা, ক্ষিপ্রতা, শক্তি, ভক্তি আসলেই অবাক করে আমাদের। আশাকরি আপনাদেরও এ তথ্যগুলো কাজে লাগবে।

Explore More:

ইতিহাসে শীর্ষ সেরা দশ ক্রিকেটার

Recent Posts