ইতিহাসে শীর্ষ সেরা দশ ক্রিকেটার


ক্রিকেট  কে না পছন্দ করে? সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয়তার পরিমাণ আকাশ ছুয়ে যাচ্ছে যেনো। সব খেলাকে হারিয়ে যেনো দখল করে নিচ্ছে সর্বস্তরের দর্শকের মন। সেরা দশের আজকের আয়োজনে থাকছে ক্রিকেট ইতিহাসে শীর্ষ সেরা দশ ক্রিকেটার এর গল্প-গাথা।

কেউ সেরা ব্যাটসম্যান, কেউ আবার শ্রেষ্ঠ উইকেট শিকারী,  কেউ কেউ আবার সেরা বোলার। শুধু তাই নয়, ক্যারিয়ারে সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়ে কেউ কেউ হয়েছেন আবার বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। হয়ে উঠেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের কালজয়ী কিংবদন্তি।

কালের আবর্তনে যেমন সবকিছু পরিবর্তন হয়, তেমনিভাবে ক্রিকেট খেলায় কিপার, ব্যাটসম্যান, ফিল্ডার, এমনকি বোলারের ভূমিকাও পরিবর্তিত। গুরুত্ব বাড়ছে প্রতিটি সেক্টর এর খেলোয়াড়দের। 

একজন ফিল্ডার থেকে শুরু করে ঘটা করে ছক্কা হাকানো প্লেয়ার সবাই এই খেলায় সমান গুরুত্ব রাখে।

কিন্তু সবার পারফরম্যান্স তো আর সব সময় সমান হয়না। কেউ বেশি ভালো খেলে কেউ একটু কম। সুতরাং সবার মধ্যে থেকে সেরা দশ নির্বাচন অনেকটাই টাফ ব্যাপার। তবুও তো কাউকে না কাউকেই এই তালিকায় আসতে হবে। 

আসুন জেনে নেওয়া যাক ইতিহাসের শীর্ষ সেরা দশ ক্রিকেটার এর গল্পঃ

আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী সেরা দশের তালিকায় আছেন, পাকিস্তানের দুই ক্রিকেটার- ইমরান খান এবং ওয়াসিম আকরাম। ভারতীয় ক্রিকেটার স্যার শচীন রমেশ টেন্ডুলকার, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার; ডন ব্র‍্যাডম্যান এবং শেন ওয়ার্ন, ক্রিকেটার; গ্যারি সবার্স, ভিভিয়ানস রিচার্ড এবং ব্রায়ান লারা- ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জ্যাক ক্যালিস- দক্ষিণ আফ্রিকা, এবং শ্রীলংকান – মুত্তিয়া মুরালিধরন। 

ওয়াসিম আকরামঃ 

ওয়াসিম আকরাম

ওয়াসিম আকরাম কে বলা হয়ে থাকে গ্রেটেস্ট ফাস্ট বলার অফ দ্যা ক্রিকেট। জন্মঃ ৩ জুন, ১৯৬৬। তিনি একজন পাকিস্তানী ক্রিকেট খেলোয়াড়। বামহাতি ক্রিকেটার হিসেবে উনার বলের গতি খুবই দ্রুত। তিনি পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের একদিনের আন্তর্জাতিক ও টেস্ট ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

সর্বমোট ৮৮১টি উইকেট নিয়ে তিন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বিশ্বরেকর্ডধারী এবং একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৫০২ টি উইকেট অর্জন করে স্থান করে নিয়েছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন এর পরেই। তাকে রিভার্স সুয়িংএর উদ্ভাবক বলা হয়। তিনি গড়ে তুলেছেন ওয়াকার ইউনুস নামে সেরা জুটি।

ক্যারিয়ারের সেরাটা দিয়েছেন তিনি। তাই পুরস্কৃত হয়েছেন নানা সম্মাননায় যেমনঃ- প্রাইড অফ পারফরম্যান্স– ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে অবদানের জন্য অর্জন করেন এই সম্মাননা। তাকে এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যালান ডেভিডসনকে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সেরা বামহাতি ফাস্ট বোলাররূপে বিবেচনা করা হয়।

ইমরান খানঃ 

ইমরান খান

পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ছিলেন অবসর পুর্বক দুর্দান্ত ক্রিকেট প্লেয়ার। জন্মনামঃ ইমরান খান নিয়াজী। ১৯৫২ সালের ৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন কালজয়ী এই ক্রিকেটার। তিনি পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় এবং অধিনায়ক।

এখন রাজনীতি তে জড়িয়ে গেলেও, তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। তার অধিনায়কত্বে পাকিস্তান ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয় করে। পাকিস্তান উনার অধিনায়কত্বে স্বাদ আস্বাদন করে বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার।

স্যার শচীন রমেশ টেন্ডুলকারঃ  

স্যার শচীন রমেশ টেন্ডুলকার

তিনি ভারতীয় ক্রিকেটে রাজ করেছেন। তাই উনাকে ক্রিকেটের পরমেশ্বর বলা হয়ে থাকে। তাকে বিবেচনা করা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে। জন্মঃ ২৪ এপ্রিল ২৪, ১৯৭৩। তিনি একজন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার। তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চমানের ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

কৈশোরে যার ক্রিকেট জগতে পদার্পণ। অর্থাৎ  মাত্র ১৬ বছর বয়সে। তার এগিয়ে চলার পথ সুগম হয় এশিয়া কাপ ক্রিকেটে প্রথম শতক করে। ২০১২ সালের এশিয়া কাপ চারদেশীয় ক্রিকেট ম্যাচে তিনি রেকর্ড করেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার ইতিহাসে প্রথম দ্বি-শতরানের মালিক তিনি।

ডন ব্র‍্যাডম্যানঃ  

ডন ব্র‍্যাডম্যান

দ্য ডন, স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। জন্মঃ ১৯০৮ সালে, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্ড্রাতে। আজ সমগ্র বিশ্বে তিনি দ্য ডন নামেই পরিচিত। নিঃসন্দেহে  তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার। মোট ৫২ টেস্টে ৯৯.৯৪ রান গড়, ২৯ সেঞ্চুরি, ১২টি ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড আচগে তার। তার নামেই ক্রিকেট ইতিহাসে একটা যুগের নাম ব্র্যাডম্যান।

১৯ বছর বয়সে তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে যিনি “ওয়াকার ইউনুস” একাদশের প্রথম সারিতেই ছিলেন। কিন্তু তার ক্রিকেট জীবনের কোনো অর্জন সহজেই আসেনি। বারবার তাকে রিজেক্টেড হতে হয়েছে।

কিন্তু থেমে থাকার পাত্র ছিলেননা তিনি। অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। ফলে উইজডেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের পুরস্কারটি ব্র্যাডম্যান একাই দশবার জেতেন। নাইটহুড পুরস্কার, ” সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত অস্ট্রেলিয়” – নামে উপাধি পান তিনি।পৃথিবী নামক গ্রহে ছিলো তার আশীর্বাদ স্বরুপ অবদান।

কিন্তু সময়ের বেড়াজালে চলে যেতে হয় এই কিংবদন্তি কে। নিয়তির ডাকে সাড়া দিতে হয় তাকে। তিনি ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০০১ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে পৃথিবীর মানুষ, বহাল আছে তার সেরা হওয়ার রেকর্ড। তিনি সেরা ছিলেন এবং থাকবেন সেরা হয়েই ক্রিকেট বিশ্বে।

শেন ওয়ার্নঃ

শেন ওয়ার্ন

পুরো নামঃ শেন কেইথ ওয়ার্ন। জন্ম: ১৯৬৯ সালের ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ভিক্টোরিয়ার ফার্নট্রি গুল্লি তে। এই বিখ্যাত ও সাবেক অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার দ্য গ্রেটেস্ট অলরাউন্ডার নামে বিখ্যাত। তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা বোলার হয়ে থাকে।

তার সময়ে অর্থাৎ, ১৯৯৩ সালে মাইক গ্যাটিংকে আউট করা তার বলটিকে গত শতাব্দীর সেরা বল বলা হয়। ওয়ার্ন একজন জেনুইন লেগ স্পিনার ছিলেন, সাথে লোয়ার অর্ডারে কার্যকরী ব্যাটিং করতেন। ২০০০-২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের অন্যতম কারিগর তিনি।

৩ ডিসেম্বর,২০০৭ সালে ‪‎মুরালিধরন‬ তাকে টপকাবার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। এমন কিংবদন্তি প্লেয়ার সেরা না হয়ে যায় কোথায়!

গ্যারি সোবার্সঃ 

গ্যারি সোবার্স

স্যার গারফিল্ড সেন্ট অব্রান সোবার্স কে শর্ট করে গ্যারি সোবার্স ডাকা হতো। তিনি বার্বাডোসের ব্রিজটাউনে ১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত ও সাবেক খেলোয়াড়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরোদস্তুর দখল তার। তিনি সর্বকালের সেরা অল-রাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। বলা হয় দ্য রাইট এক্সিলেন্ট নামে।

তার সমান দখল ছিলো, ব্যাটিং-বোলিং উভয় বিভাগেই।  ব্যাটসম্যান হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন খুবই উঁচুমানের, বোলিংয়েও  তেমন সেরাটাই দেখিয়েছেন। তিনি একজন ফাস্ট বোলার, স্পিনার। তার কীর্তি গাথা বর্ণনাতীত।

ভিভিয়ানস রিচার্ড:

ভিভিয়ানস রিচার্ড

 তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের একজন বিখ্যাত ক্রিকেটার। পুরো নামঃ স্যার আইজাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডস। জন্মঃ ৭ মার্চ ১৯৫২ সালে, সেন্ট জোন্স, এন্টিগুয়ায়। 

তিনি সর্বকালের সেরা একজন ক্রিকেটার। তার আমলের ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যাটস্‌ম্যান ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৫৬ বলে শত রান করেন। যা ২০১৪ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে সবথেকে কম বলে শতরানের বিশ্ব রেকর্ড ছিল।

তাইতো নাম অংকিত হয়েছে সেরা দশের লিস্টে। তিনি অসাধারণ, অসামান্য ক্রিকেট খেলুড়ে। কালের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ।

ব্রায়ান লারাঃ  

ব্রায়ান লারা

কে এই ব্রায়ান লারা? যার অবদান ক্রিকেট বিশ্বে অন্যতম। যিনি স্বীকৃত হয়েছেন বিশ্বের সেরা অন্যতম ব্যাটস্‌ম্যান বলে। জন্মঃ ১৯৬৯ সালের ২ মে।

টেস্ট ক্রিকেট ও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট, দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত ইনিংসে  রানের রেকর্ড তার সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে টেস্টে ১১০০০ এর উপরে রানের রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

তাকে বলা হয় ক্যারিবিয়ান বরপুত্র। প্রকৃতির একটা মনোরোম পরিবেশে বেড়ে ওঠা তার। যার প্রভাব পড়েছে ক্যারিয়ারেও। ক্রিকেটের বেশিরভাগ রেকর্ডই নিজের দখলে নিয়ে রেখেছেন এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ তারকা। ব্যাটেও সেই চিত্র এঁকে গেছেন তিনি।

জ্যাক ক্যালিসঃ 

জ্যাক ক্যালিস

পুরো নাম – জ্যাক হেনরি ক্যালিস। জন্ম ১৬ই অক্টোবর, ১৯৭৫ সাল দক্ষিণ আফ্রিকায়। তিনি শুধুমাত্র অলরাউন্ডারই নন; টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ক্যালিস ৩য় সর্বোচ্চ রানের অধিকারী এই ক্রিকেটার। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সাথে টেস্ট সিরিজে তিনি অবসর ঘোষণা করেন।

বিশ্বমানের ক্রিকেটে তার অবদান ছিলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের ইতিহাস তাকে করে তুলেছে সেরা ক্রিকেটার হিসেবে পরিপূর্ণ। অবসরে গেলেও প্রভাব কেটে যায়নি ক্রিকেট জগৎ থেকে। আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তিনি ক্রিকেট জগতে।

মুত্তিয়া মুরালিধরনঃ 

মুত্তিয়া মুরালিধরন

সেরা তো অনেকেই হয়। কিন্তু সেরাদের মধ্যেও সেরা থাকেন খুবই সীমিত লোক। আর শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার মুত্তিয়া মুরালিধরন এই সীমিত তালিকারই একজন টপার। জন্মঃ ১৭ এপ্রিল, ১৯৭২। ক্রিকেট ইতিহাসে তিনি যেমন একজন সফলতম ক্রিকেটার তেমনি একজন সফলতম স্পিনার ও।

পেশাদার ক্রিকেটে ছিল তার অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশন, ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম রিস্ট-স্পিনিং অফ স্পিনার। তার অপরিসীম অধ্যবসায় আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেছেন বিভিন্ন রেকর্ড।

এই ক্রিকেটার যেমন মাঠে ছিলেন সফল তেমনি বাস্তব জীবনে ও তিনি ছিলেন খুবই নির্ভেজাল মানুষ।

শেষকথাঃ 

ক্রিকেট জগৎ আজ জনপ্রিয়তার শীর্ষে। আর এই সেক্টর এ সেরাদের মধ্যে ইতিহাসের শীর্ষ সেরা দশ ক্রিকেটার কালের ইতিহাসেও সেরা। বিভিন্ন সেক্টরে তারা গড়েছেন অসামান্য রেকর্ড। উপরের আলোচনার শেষে এটাই বলা যায়, ” কীর্তিমানের মৃত্যু নেই “। আর উপরোল্লিখিত সেরা দশ ক্রিকেটার কালজয়ী হয়ে আছেন ক্রিকেট প্রেমীদের হৃদয়ে। তাদের মধ্যে কেউ জীবিত আবার কেউ আর নেই আমাদের মাঝে। কিন্তু সবারই সফলতার ইতিহাসে অক্ষত থাকবে চিরকাল।

Explore More:

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বত ও তাদের অজানা কিছু রহস্য

Recent Posts