বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বত ও তাদের অজানা কিছু রহস্য


 অজানা রহস্যে ঘেরা আমাদের এ পৃথিবী। আর মানুষ সেসব রসহ্যের সমাধান খুঁজে বেরায় প্রতিনিয়ত। যদি জরিপ করা যায় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি কি? তাহলে তার মধ্যে নিশ্চিত উপরের দিকে স্থান দখল করে নিবে গর্ব করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল পর্বত সমূহ।

আর এসবের মধ্যেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কত গুলো পর্বত। যাদের বিশালতা, দূর্গমতা, সৌন্দর্যতা ও ভয়াবহতা মোট কথা সব দিক দিয়েই ছাড়িয়ে গেছে বাকি পর্বতগুলোকে। পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য বা ইতিহাস যাই বলি না কেন যুগ যুগ ধরে এই পর্বতগুলোই কিন্তু বহন করে চলেছে। 

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আমাদের পৃথিবীতে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ৭,২০০ মিটারের উচ্চতা সহ প্রায় ১০৯টি পর্বত রয়েছে। কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি কোনটা দ্বিতীয়  সর্বোচ্চ বা কোন পর্বতটি বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতের তালিকায় দশম স্থান দখল করে আছে এবং এই পর্বত গুলোর নামের অর্থ গুলো কি? তাহলে আসুন জেনে আসি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু দশটি পর্বত এবং তাদের নামের অর্থ ও পিছনের গল্প।

   বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বত

 পর্বত বলতে ভূ-পৃষ্ঠের এমন একটি অবস্থানকে বুঝায় যার উচ্চতা অধিক এবং যেটি খাড়া ঢাল বিশিষ্ট। পর্বত কমপক্ষে ৬০০মিটার বা ২০০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে আবার এর থেকে উঁচুও হয়ে থাকে। সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি এগুলো।

  উঁচু উঁচু পর্বত গুলোর মধ্য থেকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বত নিয়ে আজ আলোচনা করব। তাহলে আসুন জেনে আসি সেসব উঁচ পর্বত সম্পর্কে :

 1. এভারেস্ট ( Mount Averest), নেপাল ও চীন

মাউন্ট এভারেস্ট, নেপাল ও চীন
মাউন্ট এভারেস্ট, নেপাল ও চীন

হিমালয় (হিম+আলয় অর্থ “বরফের ঘর”) নামটি শুনেনি এমন মানুষ মেলা ভার। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত  এই হিমালয়েই অবস্থিত যার নাম মাউন্ট এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে ৮,৮৪৮ মিটার (২৯,০২৯ ফুট) উচ্চতার  এ দৈত্যাকার মাউন্ট এভারেস্ট হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত। 

এটি স্যাগারমথ জোন, নেপাল ও তিব্বত এবং চীন সীমান্তে অবস্থিত হিমালয় পর্বতমালার প্রধান অংশ। এর মনকাড়া সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না। হিমালয়ের বিশালতাই সবাইকে তার দিকে আকৃষ্ট করে তুলতে বাধ্য। এজন্যই  তো প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক হিমালয়ের পাদদেশে ভিড় জমায় তার সৌন্দর্যে মেতে থাকার আশায়। আর দুঃসাহসীরা পাড়ি দেয় হিমালয়ের শেষ বিন্দুর দিকে। কিন্তু মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতের সম্পর্কে কারো জানা ছিল না। আসুন জেনে নেই মাউন্ট এভারেস্ট পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হয়ে উঠার পিছনের গল্পটি।

 আজ থেকে প্রায় ৬কোটি বছর আগে জন্ম নেয় এভারেস্ট। সবাই নিশ্চয় জানি, যেকোন পর্বতমালা সৃষ্টি হয় এই পৃথিবীর ভূগর্ভের নিচে আন্দোলনের ফলে। পৃথিবীর ভূগর্ভে মাটির নিচের স্তর গুলো থাকে প্লেটের আকারে। আর ভারতীয় উপমহাদেশের প্লেট ও দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই এভারেস্টের সৃষ্টি। 

কিন্তু সেসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে পরিচিত ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা বা কে-টু । এভারেস্ট আবিষ্কার হওয়ার গল্পটা খুবই মজার। একজন বাঙালি রাধানাথ শিকদার (১৮১৩-১৮৭০) এভারেস্টের আবিস্কার করেন। কিন্তু পর্বতটির নাম এভারেস্ট হওয়ার পিছনের ইতিহাস অন্য রকম। 

১৮০৮ সাল তৎকালীন ভারতের ব্রিটিশ শাসকরা শুরু করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গের অবস্থান বের করার অভিযান। যার ফলে শুরু হয় বৃহৎ ত্রিকোণমিতিক জ্যামিতিক পরিমাপ। এ জরিপ নিখুঁত ভাবে করার জন্য ১১শ পাউন্ড ওজনের থিওডোলাইট যন্ত্রের ব্যবহার করেন।

 ১৮৩০সালে জরিপকারীর দল হিমালয়ের পাদদেশে পৌছায় তখন নেপাল ও তিব্বতে বিদেশীদের প্রবেশও নিষেধ ছিল। অনেক বাধা অতিক্রম করে ১৮৪৭ সালের শেষের দিকে এভারেস্টের ১৪০মাইল পূর্বে কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে চলে যায়। ব্রিটিশ জরিপকারক  অ্যান্ড্রিউ ওয়াহ কাঞ্চনজঙ্গার পূর্ব দিকে পর্বত দেখতে পান যা এটার থেকে ও উঁচু।  অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও ব্যর্থ হয়।  

ব্রিটিশ জরিপকারীরা এর স্থানীয় নাম না জানায় তালিকা অনুযায়ী প্রথম নাম দেন রোমান সংখ্যা (peak-vx) বা ১৫নং চূড়া। পরবর্তীকালে  ব্রিটিশরা রাধানাথ শিকদারের সাহায্য চায়। এর উচ্চতা নির্ণয় হয় ৮,৮৪০মি. ( ২৯,০০২)। এভারেস্ট পর্বত স্থানীয় তিব্বতীদের দেয়া নাম চুমালুঙ্মা ( Chomolungma)। নেপালের সবাই এপর্বতকে  বলে Sagarmatha (স্যাগরমাথা) যার মানে হচ্ছে আকাশের দেবী। চুমালুঙ্মা অর্থ “মহাবিশ্বের দেবীমা”

 ভারতের সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রিউ স্কট ওয়াহর পরামর্শে রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি  তার পূর্বসূরী জর্জ এভারেস্টের ১৫নং পর্বত শৃঙ্গের নাম পাল্টে এভারেস্ট পর্বত নাম রাখেন ১৮৬৫সালে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জরিপে এভারেস্টের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয় ৮,৮৪৮মিটার (২৯,০২৯ফুট)। যা ১৯৭৫ সালে চীনা জরিপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় এবং ২,২০০ এরও বেশি দুঃসাহসী লোক জয় করেছে। 

খন জেনে নেয়া যাক হিমালয় পর্বত চূড়ার কিছু অভিযান ও অজানা কিছু তথ্য

১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি তেনজিং নোরগে নেপালের দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব শৈলশিরা প্রথম এভারেস্ট জয় করে। পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালে ২৫মে ওয়াং ফুঝোউ, গোনপো এবং চু ইয়িনহুয়া উত্তর শৈলশিরা জয় করেন।

১৯১৬সালে ১৬মে প্রথম মহিলা হিসেবে জাপানের Jonko Tabei এভারেস্ট জয় করে। ১৯৭৮ সালে ৮মে অস্ট্রিয়ার Habelar এবং ইতালির Rainhold প্রথম ব্যক্তি যারা অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট জয় করে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে ২০০১ সালে ২৫মে যুক্তরাষ্ট্রের Erik Weihenmayer নামে এক অন্ধ ব্যক্তি এভারেস্ট জয় করে।

প্রথম বাঙালি হিসেবে এভারেস্টে পা রাখেন ইন্ডিয়ার দেবাশিষ বসন্ত রায়।

 বাংলাদেশী হিসেবে সর্বপ্রথম এভারেস্টের চূড়ায় পদচিহ্ন এঁকেছে মূসা ইব্রাহিম (২০১০ জানুয়ারি ২৩) আর মহিলা হিসেবে প্রথম জয় করে নিশাত মজুমদার (২০১২ মে ১৯)।  সবচেয়ে বেশিবার সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি জয় করে আপা সেরপা মোট ২০বার। ২০১১ সালে Kenton Cool (কেন্টন কুল) এভারেস্টের চূড়া থেকে টুইট করে। গুগলের একটি দল ১২দিন ধরে এভারেস্টের ছবি তুলে গুগলের মানচিত্রের জন্য। 

এভারেস্টের ৮০০০মিটারের ওপরের দিক ডেথ জোন নামে পরিচিত। এভারেস্টে ভ্রমণ করতে পর্বতারোহীদের ৩০হাজার ডলারেরও বেশি টাকা খসাতে হয়। সমীক্ষা করে দেখা গেছে প্রতি ১০জনের মধ্যে ১জন ব্যক্তি সামিটের সময় মারা যায়। চার হাজারেরও বেশি মানুষ হিমালয়ে চড়ার চেষ্টা করে যাদের মধ্যে দুই হাজার মানুষ সফল হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা পর্বত হিসেবে এভারেস্টই এগিয়ে।

2. কে-টু(K2), চীন ও পাকিস্তান 

কে-টু পর্বত, চীন ও পাকিস্তান
কে-টু পর্বত, চীন ও পাকিস্তান

মাউন্ট এভারেস্টের পর বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০ পর্বতের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত হচ্ছে কে-টু। ব্রিটেশ ভারতের গ্রেট ট্রাইওনোমেট্রিকাল সার্ভে দ্বারা ব্যবহৃত স্বরলিপি থেকে এই নামটি দেয়া হয়েছে। এটি পাকিস্তানের ১ম সর্বোচ্চ পর্বত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৮,৮১১মিটার (২৮,৯০৭ফুট)। হিমালয় পর্বতমালার কারাকোরাম পর্বত রেঞ্জের অন্তর্গত। 

পাকিস্তানের গিলগিত বালতিস্তান ও চীনের জিংজিয়ানের তাক্সকোরগান সীমান্তে আবস্থিত। কে-টু পাহাড়ের বিশালতা গিয়ে পৌঁছেছে স্থল থেকে ৮,৬১১মিটার বা ২৪,২৫১ফুট উপরে। এই পর্বতটি আরোহণ করা অত্যন্ত দূর্গম ও কষ্টসাধ্য যার পথে মৃত্যুপথ যাত্রীর সংখ্যা একটু বেশিই বটে। যার ফলে এটি জংলী পর্বত নামেও পরিচিত। যার আরেক নাম স্যাভেজ মাউন্টেন। কে-টু পর্বতের চূড়ায় পৌছানোর প্রতি ৪জনের মধ্যে ১জন মারা গেছে।

3. কাঞ্চনজঙ্ঘা(Kangchenjunga), ভারত

কাঞ্চনজঙ্গা পর্বত, ভারত ও নেপাল
কাঞ্চনজঙ্ঘা, ভারত ও নেপাল

হিমালয় রেঞ্জ থেকে দক্ষিণে ১২ মাইল পরেই এ সুশ্রী কাঞ্চনজঙ্গা পর্বত দেখতে পাবেন। পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ এই পর্বতমালার ৮,৫৮৬মিটার (২৪,১৬৯ ফুট)। এই পর্বতটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সাথে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয়  সীমান্তে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতের এ অংশ কাঞ্চনজঙ্গা হিমাল নামেই মানা হয়। যার পশ্চিমে তামুর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী এবং জং সং লা শৃঙ্গ এবং পূর্ব দিকে তিস্তা নদী বয়ে চলেছে। ইন্ডিয়ার মধ্যে কাঞ্চনজঙ্গাই হলো সর্বোচ্চ পাহাড়। অনেক ধর্মানুরাগীদের কাছে কাঞ্চনজঙ্গা পবিত্র স্থান হিসেবে  মর্যাদা পায়। 

কাঞ্চনজঙ্গা অর্থ তুষারের পাঁচ রত্ন বা ধনদৌলত। যা স্বর্ণ, রূপা, রত্ন,শস্য এবং পবিত্র পুস্তক হিসেবে ধরা হয়।  কাঞ্চনজঙ্গার চূড়ায় ভোরের আলো এসে যখন পড়ে তখন মনে হয় কেউ হয়ত পর্বতের সৌন্দর্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আর সে আলোর আভা দেখা যায় শত শত মাইল দূর থেকে। ইন্ডিয়ার সীমান্তে হওয়ায় বাংলাদেশের পঞ্চগড়  থেকেও মাঝে মধ্যে কাঞ্চনজঙ্গার চূড়া অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। আর এর সৌন্দর্য সত্যি অসাধারণ।

4. লোৎসে (Lhotse), চীন ও নেপাল

লোৎসে পর্বত, চীন ও নেপাল
লোৎসে পর্বত, চীন ও নেপাল

এভারেস্টের সাথে সংযুক্ত লোৎসে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু  ১০টি পর্বতের মধ্যে চতুর্থ। এটা আট-হাজারী পর্বতশৃঙ্গের একটি। মহালাঙ্গুর হিমালের অন্তর্গত। লোৎসে অর্থ হচ্ছে দক্ষিণের  চূড়া বা শৃঙ্গ। এভারেস্ট পর্বতের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত হওয়ার কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে দক্ষিণের চূড়া অর্থাৎ লোৎসে।

 সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৫১৬ মিটার (২৭,৯৪০ফিট) উঁচুতে রয়েছে এই সুউচ্চ শৃঙ্গ লোৎসে। যা চীনের তিব্বত এবং নেপালের খাম্বু অঞ্চলের সীমান্তে অবস্থিত রয়েছে। ১৮মে ১৯৫৬ সালে ফ্রিটজ লাসসিঙ্গার আর্নেস্ট রিজ প্রথম আরোহণ করে। তবে সর্বপ্রথম একদল সুইস অভিযাত্রী লোৎসের শীর্ষে আরোহণ করেন। 

5. মাকালু (Makalu), নেপাল ও চীন

মাকালু পর্বত, চীন ও নেপাল
মাকালু পর্বত, চীন ও নেপাল

চীন ও নেপালের মধ্যবর্তী সীমানার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে একটি পর্বত অবস্থিত যার নাম মাকালু। এর অর্থ মহান কাল। ৮,৪১৮মিটার (২৭,৮২৫ ফুট) উচ্চতা বিশিষ্ট এ পর্বতটি কিন্তু পৃথিবীর পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে স্থান দখল করে আছে। যার আকৃতি দেখতে অনেকটাই মিশরের পিরামিডের মতো।

 মাকালুর চারদিকে চারটি খাড়া কোণা মতো যা দেখতে বেশি আকর্ষণীয়। এর দুটি সহায়ক চূড়া রয়েছে কাংচংটসে বা দ্বিতীয় মাকালু মূল শীর্ষ বিন্দুর উত্তর পশ্চিমে প্রায় ৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। ১৯৫৪ সালে রাইলি কিগান নামে এক পর্বতারোহীর নেতৃত্বে আমেরিকান একদল প্রথম মাকালু আরোহণ করেন।

6. চোওইয়ু (Chooyu), চীন ও নেপাল

চো ওইয়ু পর্বত, চীন ও নেপাল
চো ওইয়ু পর্বত, চীন ও নেপাল

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,২০১মিটার (২৬,৯০৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত চোওইয়ু হচ্ছে পৃথিবীর ষষ্ঠ সর্বোচ্চ পর্বত। চীন ও নেপালের মধ্য সীমার খাতে মাউন্ট এভারেস্ট থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে মহালাঙ্গুর হিমালয়ের খাম্বু উপরিভাগের পশ্চিমতম স্থানে  চোওইয়ু শৃঙ্গের সর্বোচ্চ শিখর বলে ধরা হয়। চোওইয়ু অর্থ  বৈদূর্য দেবতা। ১৯ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে সর্বপ্রথম একদল অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী এর শিখরে পা রাখেন।

7. ধবলগিরি (Dhaulagiri), নেপাল

ধবলগিরি পর্বত, নেপাল
ধবলগিরি পর্বত, নেপাল

প্রায় ২৬,৭৯৫ ফুট (৮,১৬৭মিটার) লম্বা এ শৃঙ্গটি হলো পৃথিবীর সপ্তম উঁচু পর্বত। নেপালের উত্তর দিকেই ধবলগিরির অবস্থান। ধবলগিরি মানে হচ্ছে শ্বেত পর্বত। এই পর্বতে সারাবছরই শ্বেত বরফে আবৃত থাকে তাই একে শ্বেত পাহাড় ডাকা হয়ে থাকে। দৌলগিরির দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে উভয়ই বিশাল খাঁদ বিশিষ্ট।

 আর প্রতিটি খাঁদ যার ভেতর থেকে ৮০০০মিটার উপরে বৃদ্ধি পেয়ে আবার নীচে নেমে গেছে। এসবের কারণে ধবলগিরির ভয়ংকর রূপ কে অনেক বেশি দৃঢ় করেছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে প্রায় ৩০বছর মানুষ এই চূড়াকেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে জেনে এসেছে। যার ভুল ভাঙ্গে পরে এসে। ১৯৬০ সালে ১৩মে কুট ডেম্বারগা আরোহণ করে প্রথম। 

 8. মানাসলু (Manaslu), নেপাল

মানাসলু পর্বত, নেপাল
মানাসলু পর্বত, নেপাল

নেপালের পশ্চিম কেন্দ্রীয় অংশে নেপালী হিমালয় অঞ্চলের মনসিশি হিমালের মধ্যেই রয়েছে মানাসলু পর্বত। যা পৃথিবীর অষ্টম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। মানাসলু সংস্কৃত শব্দ মানাসা থেকে উৎপত্তি এর অর্থ হলো বুদ্ধি, আত্মার পর্বত। স্থানীয়রা একে ডাকে কুতাং বলে যার মানে হলো আত্মার পর্বত।  সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৮,১৬৩ মিটারের (২৬,৭৮১ফুট)  সমান। এশৃঙ্গের অবস্থান লামজুং জেলা, নেপালের গান্দাকি অঞ্চল। ৯মে,১৯৫৬ একদল অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী এর শীর্ষে আরোহণ করেন।

     9. নাঙ্গা পর্বত (Nanga Parbat), পাকিস্তান 

নাঙ্গা পর্বত, পাকিস্তান
নাঙ্গা পর্বত, পাকিস্তান

 পৃথিবীর নবমতম আর পাকিস্তানের ২য় উচ্চতম পর্বত হচ্ছে নাঙ্গা পর্বত। এর মানে ‘ উলঙ্গ পর্বত’। আট-হাজারী পর্বতগুলোর মধ্যে এর অবস্থান সবচেয়ে পশ্চিমে। এটি দিয়ামির নগ্ন পর্বত নামেও পরিচিত। এই পর্বতের উচ্চতা প্রায় ২৬.৬৫৮ ফুট বা ৮,১২৬মিটার। এই পর্বতটি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের দিকের। তখন এটি  “কিলার মাউন্টেন” নামে অধিক পরিচিত ছিল।  কারণ এ শৃঙ্গের পথে যাত্রাই তখন মানুষের নিত্য মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়ে দাড়িয়ে ছিল। উর্দুতে একে উলঙ্গ পর্বত বলেই ডাকা হয়। 

আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে পাহাড়টি পাকিস্তানের কিন্তু এটা গিলগিত বালতিস্তান অঞ্চলের ডাইমিরেতে রয়েছে। তাই আপনি যদি এপর্বতের চূড়ায় পৌছতে পারেন তখন কিন্তু আপনি পাকিস্তানের সীমানার বাইরে চলে যাবেন। এর শীর্ষে প্রথম ১৯৫৩ সালে ৩জুলাই অস্ট্রিয়ান ও জার্মান অভিযাত্রী আরোহণ করেন। নাঙ্গা পর্বতে আরোহণ করতে যেয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে তাও অকুতোভয় ভ্রমণপ্রিয়সীরা ছুটে চলে পাহাড়ের পাদদেশে।

  10. অন্নপূর্ণা (Annapurna), নেপাল

অন্নপূর্ণা পর্বত, নেপাল
অন্নপূর্ণা পর্বত, নেপাল

নেপালের হিমালয় পর্বতমালার উত্তর কেন্দ্রীয় সীমান্তে ৫৬কিলোমিটার লম্বা স্তুপ পর্বত রয়েছে। আর এর সর্বোচ্চ চূড়াটি হচ্ছে অন্নপূর্ণা।  ৮,০৯১ মিটার ( ২৬,৫৪৫ ফিট) উচ্চতার এই পর্বতটি দখল করে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বতের মধ্যে  দশম সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গের খেতাব। 

বিশ্বের বিপদজনক কিছু পাহাড় ট্র‍্যাকিং লিস্টে অন্নপূর্ণা প্রথম দিকের স্থান নিয়েই আছে। হিসাব অনুযায়ী অন্নপূর্ণার পথে যারা যাত্রা করেছে তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ৪০% এর মতো। কিন্তু সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় অন্নপূর্ণাকে দিয়ে যায় মনকাড়া মায়াবিনী চেহারা। আর মানুষ এর টানেই হয়তো মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে ছুটে চলে অন্নপূর্ণার পথে। 

 অন্নপূর্ণা অর্থ শস্য দেবী। আর হিন্দু ধর্মানুসারীরা এ দেবী পূজা করে চলছে যুগ যুগ ধরে। এটি নেপালের গান্দাকি জোনে রয়েছে। যার পশ্চিম দিক দিয়ে কালি গান্দাকি নদী প্রবাহিত হয়েছে এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ঘাটের।  

সর্বপ্রথম মরিস হার্জগ এবং লুইস লাচেনাল ১৯৫৯সালে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেন। মার্চ ২০১২ পর্যন্ত অন্নপূর্ণা পর্বতে ১৯১জন পর্বতারোহী আরোহণের প্রচেষ্ঠা চালিয়েছে মৃত্যু ঘটেছে ৬১ জনের। এই পর্বতে পদচারণ করতে হলে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে উচ্চ মাত্রার রক ক্লাইম্বিং, আইস ক্লাইম্বিং ও মিক্স ক্লাইম্বিংয়ে। 

শেষকথা:

এগুলো হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু দশটি  পর্বত।  সত্যি সমীহ ও ভয় জাগানিয়া অলঙ্গনীয় এক একটা পাহাড়।  কিন্তু উচ্চতা এখন আর মানুষের জন্য কোন নতুন চ্যালেঞ্জিং বিষয় নয় । মানুষের এই অদম্য সাহস ও ভালোবাসা মরণকে হাতের তালুতে পুরে এই উঁচু পর্বতগুলোও জয় করে নিয়েছে।

Explore More:

পৃথিবীর সেরা দশটি পর্যটক কেন্দ্র

বিশ্বের-সবচেয়ে-উঁচু-১০-জলপ্রপাত

বিশ্বের-সবচেয়ে-উঁচু-দশটি-পর্বত