পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ১০ দেশ


পৃথিবীতে প্রায় ১৯৫ টি দেশ রয়েছে। আয়তনে বিশাল দেশগুলির নাম আমরা সবাই জানি বা এগুলির সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেক। আজকে জানব পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কয়েকটি দেশ নিয়ে,এদের আয়তন বা জনসংখ্যা নিয়ে। ভাবতেই অবাক লাগে এগুলি ও একটা দেশ বা রাষ্ট্র।

অনেকে ভাবে পৃথিবীর মানচিত্রের উপর থেকে দেখলে বাংলাদেশ কে নাকি খোঁজে পাওয়া যাবেনা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার গুন ছোট দেশ বা রাষ্ট্র রয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র এক‌টি দ্বীপ এর উপর অবস্থিত। 

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দশ দেশ

আজ তেমনি সবচেয়ে ছোট এই দশ দেশ সম্পর্কে আমরা জানব এবং আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। চলুন শুরু করা যাক –

১) ভ্যাটিক্যান সিটি:

ভ্যাটিক্যান সিটি
ভ্যাটিক্যান সিটি

ভ্যাটিক্যান সিটি সবচেয়ে ছোট স্বাধীন দেশ। এর আয়তন প্রায় ১২১ একর (০.৪৪ বর্গ কিলোমিটার) । বিশ্বের সবচেয়ে বড় গীর্জা সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা এই দেশেই অবস্থিত। ইতালির বিখ্যাত চিত্রকর মাইকেল্যাজ্ঞেলোর আঁকা ‘পিয়েতা’ ও ‘দ্য ক্রিয়েশন অফ অ্যাডাম’ এই গীর্জা তে রাখা হয়েছে। ইতালির রোম শহরের মাঝে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এই দেশটি। এই দেশের নাগরিক সংখ্যা প্রায় ৮৪০ জন এর মতো। এখানকার বেশির ভাগ কর্মী রা কাজ করতে আসে প্রাচীরের বাইরের দেশ ইতালি থেকে।

যেহেতু এই দেশে কোনো শিল্প নেই এমনকি কোনো কৃষি জমি ও নেই তাই এই দেশের মানুষ রোজ এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজ করতে যেতে হয়। তাই এই দেশটির প্রধান আয়ের উৎস হলো স্মারক বিক্রি এবং নানা দেশ থেকে প্রাপ্ত অনুদান। এছাড়াও প্রচুর পর্যটক এই ভ্যাটিক্যান সিটি তে ঘুরতে আসেন। পর্যটক দের প্রবেশ মূল্য ও এই দেশের অন্যতম আয়ের উৎস বলা যায়। এই দেশের যিনি প্রধান তার নাম হলো পোপ।

২)মোনাকো:

মোনাকো
মোনাকো

মোনাকো দেশটির আয়তন প্রায় ৫৪১ একর (২ বর্গ কিলোমিটার)। মোটামোটি ঢাকা ভার্সিটি আয়তনের সমান এই দেশটি। এই দেশটি এমন এক‌টি স্বাধীন রাষ্ট্র যার তিনদিকে ফ্রান্স এবং একদিকে সাগর দিয়ে ঘেরা। ঘনত্বের দিক থেকে মোনাকো পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তর জনবহুল ধনী রাষ্ট্র। ৭০০ বছর ধরে এই দেশটি শাসন করে গ্রিমালডি পরিবার। বর্তমানে দেশটি শাসন করছেন যুবরাজ দ্বিতীয় আলবার্ট। এই দেশটিতে বাস করে মাত্র ৩৬০০০ মানুষ।

ধনী ব্যাক্তিরা প্রচুর আসেন এই দেশে টাকা পয়সা ওড়াতে। এই দেশে জুয়া খেলা কোনো আইনি অপরাধ নয়। আগে এই দেশের রাজধানীর নাম ছিলো মন্টিকার্লো। ১৯২৯ সালে এই দেশের নাম দেওয়া হয় মন্টিকার্লো কার-রেলি। এই শহরের রাস্তায় উৎপাদিত হয় পৃথিবীর একমাত্র বৃহত্তম ফর্মূলা ওয়ান রেস। এই দেশের উপর দিয়ে চলে গেছে ফর্মুলা ওয়ান এর ট্র্যাক।

৩)নাউরু:

নাউরু দেশটির আয়তন প্রায় ২১ বর্গ কিলোমিটার। এই দেশটির আয়তন ঢাকার ধানমন্ডির আয়তনের সমান প্রায়। কয়েক হাজার বছর আগে পলিনেশিয়ান রা ক্যানো করে এই নাউরু দেশে এসেছিল। জার্মানি ১৯৮৮ সালে এই দ্বীপ টি দখল করে ফেলেছিল এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত তাদের দখলেই ছিলো এই দ্বীপ টি। এর পরে জার্মানির বিভিন্ন জায়গায় হানা দেয় অষ্ট্রেলিয়া।

১৯৬৬ সালে নাউরু স্বাধীনতা লাভ করে। প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখানে বাস করে যা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। এই দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ সরকারি কাজ করে আর বাকিদের কাজ নেই বললেই চলে। আবহাওয়ার জন্য এদেশের মানুষ একটু বেশী স্থুলতার অধিকারী হয়ে থাকে। এদেশের প্রধান আয়ের উৎস হলো ফসফেট খনি।

৪) টুভালু:

 টুভালু
টুভালু

টুভালু দেশটির আয়তন প্রায় ২৫ বর্গ কিলোমিটার। বলতে গেলে ঢাকা মিরপুর এলাকা থেকে ছোট এই টুভালু দেশটি। এই স্বাধীন দেশটি মূলত ন’টি দ্বীপ এর উপর গঠিত এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের পাপুয়া নিউগিনির পাশে অবস্থিত। যেহেতু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে কয়েক ফুট উপরে এই রাষ্ট্র টি , সেহেতু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে জলতল বাড়লে কয়েক দশকের মধ্যে ডুবে যেতে পারে এই দেশটি।

এখানকার লোকদের জীবনযাত্রা অনেক কঠিন। খাবার পানির অনেক অভাব। একমাত্র বৃষ্টি হলে খাবার পানি মেলে। মাত্র ১০ হাজার মানুষ এখানে বাস করেন। এই ৮ কিলোমিটার রাস্তার দেশটিতে মাত্র ১ টি হাসপাতাল রয়েছে। দেশটির আয়ের উৎস নারকেল চাষ এবং পর্যটন শিল্প।

৫) সান মারিনো:

সান মারিনো
সান মারিনো

এই স্বাধীন রাষ্ট্রের আয়তন ৬২ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের থেকে প্রায় ২৪০০ গুন ছোট এই সান মারিনো দেশটি। সান মারিনোর চারদিকে আছে ইতালি, অনেকটা ভ্যাটিক্যান সিটির মতোই। ইতালির উত্তর পাশে পাহাড়ী এলাকার মাঝে লুকিয়ে আছে এই সান মারিনো নামক ছোট দেশটি। সান মারিনো দেশের অনেকেই বলে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো স্বাধীন দেশ।  মাত্র ৩০০০০ মানুষ এখানে বাস করে। 

প্রায় ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে এই সান মারিনো দেশের নাম পাওয়া যায়। এই দেশটির মূল আয়ের উৎস হলো ব্যাংক ব্যাবস্থাপনা এবং পর্যটন শিল্প। এই দেশটিতে বেকারত্ব নেই। এই দেশটির ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে এক‌টি অদ্ভুত রেকর্ড আছে। ১৯৯৩ সালের দিকে ইংল্যান্ডকে ৮ সেকেন্ড এ গোল দিয়েছিল সান মারিনো দেশের ফুটবল টিম। সেই রেকর্ড আজও কোনো বড় বড় ফুটবল খেলোয়া দেশের টিম ভাঙতে পারেনি।

৬)লিচেনস্টাইন :

লিচেনস্টাইন
লিচেনস্টাইন

লিচেনস্টাইন এর আয়তন প্রায় ১৬০ বর্গকিলোমিটার। এই দেশ বাংলাদেশ এর তুলনায়  ৯০০ ভাগ এর এক ভাগ মাত্র। এরা প্রায় মধ্যযুগ থেকেই স্বাধীন দেশ নামে পরিচিত। এই দেশটি মুলত জার্মান ভাষাভাষির দেশ। দেশটির বেশিরভাগ ই পাহাড়। আল্পসের মাঝে লুকিয়ে থাকা রাষ্ট্র এই লিচেনস্টাইন। সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার সাথে সীমানা আছে এই লিচেনস্টাইন দেশটির।

এই দেশটি পৃথিবীর অন্যতম এক‌টি ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এই দেশের মূল আয়ের উৎস হলো ব্যাংক ব্যাবস্থাপনা এবং পর্যটন শিল্প। বিশ্বের অনেক দেশের লোকেরা এই দেশের ব্যাংকে টাকা জমান। লিচেনস্টাইন এ টেক্স খুবই কম। তাই এদের ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সুদ পাওয়া যায়।

এখনও রাজবংশের লোকেরাই শাসন করে এই লিচেনস্টাইন দেশটি।

৭)মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ :

মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ

এই দ্বীপরাষ্ট্রের আয়তন প্রায় ১৮১ বর্গ কিলোমিটার। এই রাষ্ট্র টি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। এই রাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার। মাত্র ১৮১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে মাইক্রোনেশিয়ানরা বাস করেন। আগে প্রায় ষোড়শ শতাব্দীর দিকে ইউরোপীয়ানরা এই দেশটি শাসন করত। দেশটির মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার ব্যবহৃত হয়।

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান এই দেশটিকে হানা দিয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা এই দেশটিকে শাসন করত। এই দেশটি স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। এই দেশের মূল উপার্জন আসে সামুদ্রিক টুনা মাছ থেকে। ১৬০ প্রজাতির কোরাল এবং ৮০০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় এখানে। আমেরিকার প্রায় ৬৭ টি পরমাণু বোমা পরীক্ষা করা হয়েছিল এই দেশের মুল ঘাঁটি থেকে।

৮)সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস :

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস
সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস

এই দেশের আয়তন প্রায় ২৬৯ বর্গ কিলোমিটার। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এর মাঝে মোটামোটি দুটি দ্বীপ নিয়ে এই রাষ্ট্র টি গঠিত। এই রাষ্ট্র টি সেন্ট কিটস নামেই বেশি পরিচিত। বলা হয় আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন দেশ এই সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস। আগে ষোড়শ শতাব্দীতে ফরাসি ও ব্রিটিশ রা এই দেশ শাসন করত। তার ও আগে বাস করত আমেরিকার উপজাতিরা। 

এটি স্বাধীন হওয়ার পরে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ ভুক্ত। তাই এই দেশের প্রধান ইংল্যান্ড এর রাণী এলিজাবেথ। এই দেশে অনেকগুলি সুন্দর বাগান ওয়ালা রিসোর্ট আছে। দেশটির মুল আয়ের উৎস আসে আখ চাষ থেকে। এছাড়াও অনেক আয় আসে পর্যটন শিল্প হতে।

৯) মালদ্বীপ:

মালদ্বীপ
মালদ্বীপ

এই দেশের আয়তন প্রায় ২৯৮ বর্গ কিলোমিটার। এই দেশটি ভারত মহাসাগর এর উপর অবস্থিত। দেশটি প্রায় হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত প্রায় ১১৯২ টির মতো। এটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেশের মতো অনেকটা। সব দ্বীপ গুলোকে একসাথে করলে এর আয়তন হবে ৯০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। মালদ্বীপ কে বিশ্বের অন্যতম দ্বীপ রাষ্ট্র বলা হয়। এই দেশটি এখনও ব্রিটিশদের আওতায়।

আগেও ব্রিটিশরা,ডাচ,পর্তুগিজ রাই শাসন করত এই দ্বীপ রাষ্ট্র টি। ১৯৬৫ সালে এই দ্বীপ রাষ্ট্র টি স্বাধীন হয়। ২০০৪ সালের সুনামি তে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয় এই দ্বীপ রাষ্ট্র টি। এখানে অসামান্য কিছু সুন্দর সাদাবালির সমুদ্র সৈকত আছে।অনেক পর্যটক বা ভ্রমণপিপাসু লোকেরা এখানে আসে প্রতিবছর এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তাই এই দেশের প্রধান আয়ের উৎস হলো পর্যটন শিল্প।

১০) মাল্টা:

মাল্টা
মাল্টা

সর্বশেষ যেই দেশটির নাম জানব সেটি হলো মাল্টা। এই দেশটির আয়তন ৩১৬ বর্গ কিলোমিটার। এই মাল্টা দেশটি অনেকগুলি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। অনেকগুলি দেশ হলেও সেখানকার মাত্র তিনটি দ্বীপে মানুষ বসবাস করে। মাত্র পাঁচ লাখ লোক এই ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্রে বসবাস করে। ঘনত্বের দিক থেকে এই দেশটিও অন্যতম জনবহুল দেশ। আগে ব্রিটিশরা এই দেশটি শাসন করতেন।

বলা হয় ১৯৬৪ সালে এই দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমানে এটি এক‌টি স্বাধীন দ্বীপ রাষ্ট্র। দেশটি যেহেতু দ্বীপ এর উপর তাই দেশটি অনেক সুন্দর। তাই প্রতি বছর অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। এখানকার আবহাওয়া অনেক সুন্দর এবং ঝলমলে। ৭০০ বছরের পুরোনো অনেক ইতিহাস আছে এই দেশে। সুতরাং এই দ্বীপ রাষ্ট্রের একমাত্র আয়ের উৎস হলো পর্যটন শিল্প।

এই ছিলো বিশ্বের কয়েকটি ছোট দেশের তালিকা। এদের দেশগুলি ছোট হলেও এদের জীবন যাত্রার মান অনেক উন্নত। এদের সংস্কৃতি,ইতিহাস এবং প্রাচুর্যে এরা সত্যিই উজ্জ্বল হয়ে আছে পৃথিবীর বুকে।

Explore More:

পৃথিবীর সেরা দশটি পর্যটন কেন্দ্র- জেনে নিন কিছু তথ্য

Tanjila Jahan Any

I am a professional content writer and graphics designer . My background is CSE.

Recent Posts