বাংলাদেশে শীর্ষ ১০ জনপ্রিয় ভাস্কর্য


ভাস্কর্য হলো একটি ত্রি-মাত্রিক শীল্পকলা। রেনেসাঁর যুগ থেকে ভাস্কর্যের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। কখনো কাঠ কিংবা প্রস্তর দিয়ে তৈরি হয় ভাস্কর্যের রূপ। ভাস্কর্যের রূপকলা শুরু হয় সাধারণত কিছু দেব দেবীকে ঘিরে অথবা পৌরাণিক গল্প অবলম্বন।

শিল্পীর নিপুণ হাতে গড়ে ওঠা এসব ভাস্কর্য একেকটা অর্থ বহন করে। কখনো কখনো ইতিহাস তুলে ধরে আবার কখনো কখনো করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়। মাঝে মাঝে ভাস্কর্য গুলোকে বিপ্লবী চেতনা হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ভারত উপমহাদেশে ভাস্কর্য গড়ার ইতিহাস বহু আগ থেকে।তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এই শিল্প সগৌরবে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ। 

বাংলাদেশে শীর্ষ জনপ্রিয় ভাস্কর্যঃ

আমাদের বাংলাদেশ শিল্প-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের গল্প গুলো এদেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও ভাস্কর্যের মধ্যে ফুটে ওঠেছে শিল্পীর নিপুণ হাতের মধ্য দিয়ে। তেমনি  শীর্ষ ১০ ভাস্কর্য নিয়ে আজকের আয়োজন। এই ভাস্কর্য গুলো যেমন সুন্দর তেমনি ইতিহাস আর ঐতিহ্য বহন করে চলেছে বছরের পর বছর। শুধু তাই নয় এই সব ভাস্কর্য এখন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। 

১। জাগ্রত চৌরঙ্গীঃ

দেশে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য যা মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধে নিহত ও আহত বীরদের অসামান্য আত্মত্যাগ স্মরণে ১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়েছিল জাগ্রত চৌরঙ্গী। ডান হাতে গ্রেনেড, রাইফেল হচ্ছে বাঁ হাতে। মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্যটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থিত।

জাগ্রত চৌরঙ্গীর উচ্চতা ৪২ ফুট ২  ইঞ্চি । পুরো নিচ থেকে ২৪ ফুট ৫ ইঞ্চি ওপরে দেখা যায় এক সৈনিকের এক হাতে গ্রেনেড ও অন্য হাতে রাইফেল ধরে আছে। ইট, গ্বালি-সিমেন্ট, ইত্যাদি নিপুণ ভাবে  নির্মিত এ ভাস্কর্যটি। ২০৭ জন শহীদ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম  যার মধ্যে এতে দেখা যায় ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিন নম্বর সেক্টরের ১০০ জন ও ১১ নম্বর সেক্টরের  দেখতে পাবেন। জিরো পয়েন্ট হতে  গাজীপুরের বাস গুলো যেগুলো ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলে এসব বাসে করে যেতে পারবেন। 

এর পেছনের গল্পে জানা যায়, ১৯৭১ সালে জয়দেবপুর (পরে গাজীপুর) সেনানিবাসের ভাওয়াল রাজবাড়িতে ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কার্যালয়। ২৫-৩০ জন ছাড়া সবাই ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। পাকিস্তানিরা এদেশের বাঙালি দমনের  জন্য সকলকে ১৫ মার্চের মধ্যে রাইফেল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু  বাঙালি সেনারা রাজি না হলে তার পরিপ্রেক্ষিত ১৯ মার্চ সকালে তত়্কালীন  কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিতে জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসেন।  

 বিভিন্ন এলাকা থেকে স্থানীয় জনতা এ খবর জেনে  লাঠি, তীর-ধনুক নিয়ে জয়দেবপুর বটতলায় জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় যুদ্ধ এবং ওই যুদ্ধে ফুটবলার হুরমত আলী সহ মনু খলিফা ও কানু মিয়া এবং কিশোর নিয়ামত শহীদ হয়।  পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে জয়দেবপুরের এই সম্মুখযুদ্ধের পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পুরো বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে একটাই, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। সেইসব শহীদ মহান মুক্তিযোদ্ধারদের  স্মৃতি ধারণ করতে তৈরি করা হয় জাগ্রত চৌরাঙ্গী। 

২। অপরাজেয় বাংলাঃ

মুক্তি যুদ্ধের ভাস্কর্য বলতেই আমরা চিনি অইরাজেয় বাংলাকে। তিনটি নিশ্চল মূর্তি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ঠিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে অবস্থিত এ ভাস্কর্যটির নাম “অপরাজেয় বাংলা”। কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন এবং বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। ৬ ফুট বেদীর উপর নির্মিত ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট। এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।

স্বাধীনতার এ প্রতীক তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন গুণী শিল্পী ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ।ভাস্কর্যটিতে তিনজন তরুণের মূর্তি প্রতীয়মাণ। 

এদের মধ্যে দুজন পুরুষ এবং একজন নারী। বামপাশে জিন্সপ্যান্ট পরা অপেক্ষাকৃত খর্বকায় তরুণ যার হাতে থ্রি-নট রাইফেল এবং চোখে-মুখে স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনা। সর্ব ডানে রয়েছে প্রত্যয়ী এক নারী যোদ্ধা যিনি ছিলেন সেবিকা। 

তিন মুক্তিযোদ্ধা যারা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের বেদীতে দাঁড়ানো,তাদের প্রতিচ্ছবি যেন অন্যায় ও বৈষম্য দূর করে দেশে সাম্য প্রতিষ্ঠার গান গাইছে। 

৩।সাবাশ বাংলাদেশঃ  

“সাবাস বাংলাদেশ

এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়”

সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই চার লাইন বুকে শক্তি যোগায়। নাহ কোন কবিতার লাইন না, সাবাশ বাংলাদেশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত মুক্তি যুদ্ধের স্মৃতি জড়ানো ভাস্কর্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের দক্ষিণ পাশে সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইউমসহ আরো অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে।  ভাস্কর্যটি ৪০ বর্গফুট মাপের একটি বেদির উপর অবস্থিত। লুঙ্গি পরা এবং মাথায় গামছা বাঁধা গ্রামীণযুবা- কৃষক সমাজের প্রতিনিধি যার এক হাতে রাইফেল ধরা, মুষ্টিবদ্ধ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । প্যান্ট পরিহিত অন্য যুবকটি শহুরে যুবকের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়িয়ে প্যান্ট পরিহিত অন্য যুবক দুই হাত দিয়ে ধরে রয়েছে রাইফেল, এছাড়াও বাতাসের ঝাপটায় চুল ওড়া কোমরে গামছা বাঁধা যুবকও রয়েছে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে। 

  মঞ্চের পিছনের সিঁড়ির উপর দেয়ালের গায়ে নারী-পুরুষ সহ শিশু, বৃদ্ধ সমাজের সকল বয়সী মানুষের মিছিলের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। যুবক-যুবতী রাইফেল হাতে, একতারা হাতে আছে বাউল, সেই সাথে গেঞ্জিপরা এক কিশোর তাকিয়ে আছে পতাকার দিকে। সব মিলিয়ে একজন দক্ষ শিল্পী তুলে ধরেছেন গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের একতা ঘোষণা।

৪।সংশপ্তক ভাস্কর্যঃ

নিজের জীবনেকে  তুচ্ছ করে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এদেশে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, কামার-কুমার, ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। নিজের জীবনের পরোয়া না করে ঝাঁপিয়ে পড়া এই অকুতোভয় বীররা হলো একেকজন সংশপ্তক।

শত্রুর আঘাতে হারিয়েছেন এক হাত ও এক পা হারিয়েও এগিয়ে যেতে থাকেন শত্রুর দিকে। দৃঢ় মনোবলে সংশপ্তক ভাস্কর্যটিতে দেখা যায় রাইফেল উঁচিয়ে লড়ে যান শত্রুর বিপক্ষে বীর সেনারা,তেমনি স্মৃতি নিয়ে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা এই ভাস্কর্য । জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬শে মার্চ ১৯৯০ সালের স্থাপিত হয় এই ভাস্কর্যটি। ঢাকা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দেখা যায়  এক পায়ের ওপর এক মুক্তিযোদ্ধা ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।  

৫।বিজয় ৭১ ভাস্কর্যঃ

পরম আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের চিহ্ন ‘বিজয় ৭১’ শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, ছয় ফুট উঁচু বেদির ওপর এক কৃষক মুুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন আকাশ পানে। ডান পাশেই শাশ্বত বাংলার সংগ্রামী নারী কাঁধে রাইফেল নিয়ে দৃঢ়চিত্তে দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ডাক। অন্যদিকে তেজোদীপ্ত এক ছাত্র বাঁ হাতে রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গ্রেনেড ছোড়ার ভঙ্গিমায়, এটি বাঙালির প্রেরণার উৎস।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে গড়ে উঠা এই ভাস্কর্যটি দেখতে এসে অনেক বাবা মা তাদের সন্তানদের মুক্তি যুদ্ধের গল্প শোনান। প্রাচীর না থাকায় অনেক দূর থেকেও এই ভাস্কর্যটি দেখা যায়।

 শ্যামল চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ভাস্কর্যটির  ১৯৯৮ সালে নির্মাণ শুরু হলেও শেষ হয় দুই বছর পর ২০০০ সালে । 

৬।স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যঃ

 ১৮ জন শহীদের ভাস্কর্য দিয়ে নির্মিত স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য এটি। বাঙালির ইতিহাসে ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সমস্ত বীরত্বগাথাকে ধারণ করে নির্মিত এ ভাস্কর্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে এই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির স্থপতি শামীম শিকদার। সেই ৬৬ সালের স্বাধীকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ, সেই সাথে ২৫ মার্চের ভয়াল কালরাত্রি, এবং  বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ২৬ শে মার্চ ও বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় ১৬ ডিসেম্বরের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

ফুলার রোডে ১৯৮৮ সালে ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে মানে ১০ বছর পরে ভাস্কর্যটিকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ হল যা ফুলার রোডে অবস্থিত, সেই সাথে এর মাঝে জগন্নাথ হলের সড়ক  ও বুয়েট সংলগ্ন সড়কদ্বীপেও যুক্ত হয়। যার নাম বদলে দেওয়া হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করে নির্মিত।

৭।মুক্ত বাংলা: 

১৯৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম  ভাস্কর্য যার নাম করন করা হয় ‘মুক্ত বাংলা’নির্মাণ করে। বিশ্ববিদ্যালয়েরীকেবারে প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতে এই আধুনিক স্থাপত্য শিল্পে ঠিক ডানদিকে অবস্থিত সবার নজর কাড়ে।প্রশাসন ভবনের পূর্বপাশে স্থাপিত হয় ‘মুক্ত বাংলা’। খ্যাতিমান শিল্পী রশিদ আহমেদের নকশার ভিত্তিতে একে অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ দেয়া হয়। ‘মুক্ত বাংলা’র সাতটি স্তম্ভ সম্বলিত গম্বুজের ওপর রয়েছে হাতের মুঠোয় শকত করে ধরে রাখা মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার রাইফেল। এটা সাত সদস্যের মন্ত্রিসভার প্রতীক যা মুজিবনগর সরকারের অধীনে গঠিত হয়েছিল।

মুক্ত বাংলার প্রবেশ পথে রয়েছে বৃত্তাকার কালো রঙ্গের একটি প্লেট। কালো রঙ্গের এই প্লেটটিতে নির্মাণশৈলীর বর্ণানা দেওয়া রয়েছে। মুক্ত বাংলার চারপাশ সিমেন্টের খুঁটির উপর লোহার শিকল দিয়ে ঘেরা। প্রতিটি স্তম্ভ এর দিকে তাকালে মনে হবে প্রত্যেকে একে অপরের হাত ধরে চোখে বুনেছে স্বাধীনতার স্বপ্ন। 

সামনের তৈরি সাতটি আর্চ  দেখবেন সম্বলিত একটি অর্ধ উদিত উদীয়মান সূর্য। এরপ  মূল মেঝে মানে বেদীর দিকে নীল টাইলস দিয়ে মোজাইক করা। বাংলার মানুষ স্বাধীন হতে চেয়েছিলো তা বুঝাতে নীল টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। বেদীর উপর থেকে দ্বিতীয় ধাপে কালো পাথর বসানো। যা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মহান আত্মত্যাগ নির্দেশ করে।এছাড়া রয়েছে কিছু ফুলের গাছ যা মুক্ত বাংলার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৮। স্ফুলিঙ্গ ভাস্কর্যঃ

পুলিশের দেওয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১৯৬৯ এর ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি রাস্তায় নেমে পড়ে ছাত্ররা। ছাত্ররা পুলিশের একটি গাড়িতে সেদিন আগুন লাগিয়ে দেয়।  পুলিশ সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ছাত্রদের উপর গুলি করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। তখনি এগিয়ে যান প্রক্টর শামসুজ্জোহা। 

শামসুজ্জোহা ছাত্রদের গুলি না করার জন্য পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করেন। কিন্তু পাক সরকারের পুলিশ বাহিনী কথা শোনেননি। উলটো পুলিশ বাহীনী  শামসুজ্জোহাকেই গুলি করে। নিজের জীবন উতস্বর্গ করে এভাবেই  ছাত্রদের রক্ষা করেন মহান শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা।১৯৬৯ এর গণঅভুত্থানের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী যাকে নিয়ে নির্মিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্ত স্ফুলিঙ্গ।১৫ ফুট উচ্চতা, ৩৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট ‘স্ফুলিঙ্গ’ শীর্ষক এই ভাস্কর্যটিতে শহীদ ড. শামসুজ্জোহার ৩ ফুট উঁচু অবয়বের প্রতিকৃতি আছে।

৯। স্বোপার্জিত স্বাধীনতাঃ

শামীম সিকদার ও তাঁর সহকারী ছিলেন শিল্পী হিমাংশু রায় দুজনে মিলে  বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পশ্চিম পাশে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যোগায় এমন একটি ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন ১৯৮৮ সালে ২৫ শে মার্চ। যদিও এটি ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর থেকে বানানো শুরু হয়।। একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদারের অত্যাচারের একটি খণ্ড-চিত্র এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। 

১০। অদম্য বাংলাঃ 

বলিষ্ঠ ও তেজোদীপ্ত চার মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি নিয়ে নির্মিত অদম্য বাংলা যা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত।

এক নারীসহ চারজন যারা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মাকে রক্ষায় সংকল্প বদ্ধ  বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলায় দেখানো হয়েছে । 

যাদের প্রত্যেকের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র এবং সেই অস্ত্র গুলো কারো হাতে, কারো বা কাঁধে ঝোলানো। গুলিভর্তি কেসও আছে। ঘামে-জলে ভেজা শরীর, কাদায় কাপড় লেপ্টানো। তবু সবার চাহনি উজ্জ্বল, প্রখর। কারো হাত মুষ্টিবদ্ধ, উত্তোলিত। দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি শরীরে, ঋজুতায় ভরা। চারজনই বিপরীত মুখ করে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে; প্রতিপক্ষকে দমনে অনমনীয়, দৃঢ়চেতা। বুকে শুধু একই শপথ মুক্ত হোক বাংলা। 

পুরো মুক্তিযুদ্ধের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা রয়েছে এই ভাস্কর্য ২৩ ফুট উচ্চতার  একটি বড় বেদির ওপর স্থাপিত। বেদির চারপাশে টেরাকোটার কারুকাজ।

শেষ কথা 

বাঙালীর ইতিহাস যেন কথা বলে প্রতিনিয়ত এই অমূল্য শিল্পগুলোর মধ্য দিয়ে। আর এই শিল্পগুলোই বাংলা এবং বাঙালীর গৌরবময় উজ্জ্বল গাঁথা এক স্মৃতি স্মারক । কেউ যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দেখতে চান তাহলে বলবো একবার ঘুরে আসুন এই ভাস্কর্য গুলোর সামনে থেকে।  

Explore More:

পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ১০ ধনী ফুটবল ক্লাব এর ইতিবৃত্ত

Recent Posts