ভারতীয় ফুটবলের করুণ ইতিহাস (খালি পায়ে ফুটবল খেলার ইতিহাস)


বিশ্বকাপ ফুটবল এক স্বপ্নের নাম। আপনারা সবাই জানেন যে প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর ফিফা নির্ধারিত বিভিন্ন স্বাগতিক দেশে অনুষ্ঠিত হয় এই বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবলপ্রেমী দর্শকেরা অধীর আগ্রহে দিন গুনেন এই বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য। 

বিশ্বকাপ ফুটবলে জয়লাভ করা যেমন স্বপ্নের মতো, তেমনি এতে অংশগ্রহণ করাও খুব একটা সহজ বিষয় নয়। প্রাক-বাছাই এবং বাছাই শেষেই অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয় এই বিশ্বকাপে।

অনেক শক্তিশালী দলও বুকে হাত রেখে বলতে পারে না যে তারা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারবে। যেমন; ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী ফুটবলাররা ২০০৬ এবং আর্জেন্টিনা ২০১০ সালে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশ্বকাপ ফুটবল শুধুই স্বপ্নের নাম। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, বাংলাদেশ,  ভুটান, শ্রীলঙ্কা আর বাদবাকি দেশগুলোর কাছে বিশ্বকাপে জয়লাভ করা তো দূরের কথা, তাদের কাছে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ও সোনার হরিণ হাতে পাওয়া মতোই। দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বকাপ থেকে এতোটাই পিছনে।

তবে এই দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ ভারতের একবার সুযোগ হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার। কিন্তু এমন সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও ভারত বিশ্বকাপ খেলেনি সে বছর। কিন্তু কেনো?

 ভারতীয় ফুটবলের করুণ ইতিহাস কী ছিল এবং কেনোই বা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও খেলায় অংশ নেয় নি ভারত? চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক এই আর্টিকেলে।

ভারতীয় ফুটবলের করুণ ইতিহাস যা জানলে অবাক হবেন আপনিওঃ

১৯৫০ এর ফুটবল ইতিহাস 

১৯৩০ সালে স্বাগতিক উরুগুয়েতে ফুটবল বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয় এবং উরুগুয়েই জয়লাভ করে সে বিশ্বকাপে। এর পর ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালেই প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় ব্রাজিলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিফা উঠে পরে লাগে বিশ্বকাপ নতুন করে শুরু করার জন্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় অনেক দেশ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরে। আর্থিক সমস্যার জন্য ইউরোপের কোনো দেশই তাদের দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন করতে রাজি হয়নি। এই অবস্থায় ব্রাজিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল তাদের দেশে আয়োজন করার প্রস্তাবনা দেয় ফিফা কে।ফিফা (ফুটবল ফেডারেশন)  সানন্দে গ্রহণ করে নেয় এই প্রস্তাবনাকে।

বর্তমানে মোট ৩২ টি দেশ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। তবে সেবছর(১৯৫০) সালে মাত্র ১৬ টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট। স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দেশসহ, ইউরোপের ৭ টি দেশ, আমেরিকা থেকে ৬ টি এবং এশিয়া থেকে ১ টি দেশ অংশগ্রহণ করার কথা ছিল এই টুর্নামেন্টে। 

১৯৪৮ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অলিম্পিক খেলে শেষ পর্যায়ে হেরে যায় ভারত। ভারত ফুটবল দল খালি পায়ে, কয়েকজন মোজা পরে সেই অলিম্পিক খেলেছিল। তবে ভারত দুইটা পেনাল্টির পরও ১-১ ড্রতে, এবং খেলার প্রায় শেষ মূহুর্তে ২-১ গোলে হেরে যায় ফ্রান্সের কাছে। তবে অলিম্পিকে হেরে যাওয়ার পরও খালি পায়ে অসাধারণ কৌশলে খেলার জন্যই বিশ্বের কাছে বিশেষ নজরে উঠে আসে ভারত।

ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় যে, মহাদেশগুলোর মধ্যে বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হবে, এবং বাছাইপর্বে বিজয়ী ১৬ টি দেশ অংশ নিবে বিশ্বকাপের ফাইনাল টুর্নামেন্টে। কিন্তু অনেক দেশ এই বাছাইপর্বের বিরোধিতা  করে বিশ্বকাপ থেকে তাদের নাম সরিয়ে নেয়।

এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা(বর্তমানে মায়ানমার) এবং ভারতের মধ্যে চূড়ান্ত বাছাইপর্বের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবং বাছাইপর্বে বিজয়ী একটি দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়।তবে এই বাছাইপর্বের বিরোধিতা  করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও বার্মা তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে। এদিকে ভারতের আসে সুবর্ণ সুযোগ।বাছাইপর্ব থেকে  বাকি তিন দেশ নিজেদেরকে প্রত্যাহার করার জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ হয় ভারতের।

সেজন্য ফিফা ভারতকে আমন্ত্রণ পাঠায় বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করার জন্য । ১৯৪৯ সালে এআইএফএফ (অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন) বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার উদ্দেশ্যে একটি সাব -কমিটিও গঠন করেছিল৷ অথচ অবাক করার বিষয় হচ্ছে ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে এআইএফএফ এর সাধারণ সভায় জানা যায় যে ওই কমিটি একবারের জন্যেও মিলিত হয়নি ৷ তা সত্ত্বেও ১৯৫০ এর মে মাসে ভারতীয় দলের বিশ্বকাপ যাত্রার প্রস্তুতি অনেকটাই নিশ্চিত মনে হচ্ছিল ৷

 ১৫ -১৬ জুন এর দিকে ভারতীয় দলের ব্রাজিল যাত্রার দিনও স্থির হয়েছিল৷ ভারতের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের প্রত্যাশার পারদ যখন তুঙ্গে , ঠিক সেই সময়টাতে আকস্মিক ভাবে এআইএফএফ সভাপতি মইনুল হক মণীন্দ্র দত্ত রায় এবং পঙ্কজ গুন্তের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ২৩ মে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানালেন যে, ভারত বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। 

সুযোগ পাওয়ার পরও ভারত কেনো খেলে নি বিশ্বকাপে?

“গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ” খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখেনা এমন দেশও কি আছে? ফুটবলপ্রেমী দর্শকেরা এই বিশ্বকাপ দেখতে চারটা বছর প্রতীক্ষায় বসে থাকেন আর যারা এই খেলায় অংশ নিতে চান তাদের কঠোর অনুশীলন চলতে থাকে সারা বছর জুড়ে। আর এদিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার কাছে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা তো সোনার হরিণই হাতে পাওয়ার মতো।

অথচ ভারত ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও পায়ে ঠেলে দেয়। ভাবা যায়? কেনো এমন সুবর্ণ সুযোগকে পায়ে ঠেলে দিল ভারত? এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েও না খেলার অনেক কারণ প্রচলিত আছে বিশ্বজুড়ে। অনেকে অনেক কারণ দেখান এ নিয়ে।

অনেকের ধারণা, ভারত খালি পায়ে খেলে অভ্যস্ত। তারা খালি পায়ে ফুটবলকে যেভাবে রপ্ত করেছেন কিংবা আওতায় এনেছেন বুট পরে তা সম্ভব নয়।জানা যায়, সে বছর ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় বুট ছাড়া অর্থাৎ খালি পায়ে কোনো খেলোয়ার বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না। অথচ ভারত খালি পায়েই ফুটবল খেলায় পারদর্শী। তাই তারা বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টকেও প্রত্যাহার করেন।

সে সময়টাতে ভারতীয়রা ফুটবলকে গ্রহণ করেছিল খালি পায়ে। অথচ বাইরের বিশ্বে ফুটবলকে গ্রহণ করা হয়েছিল বুট পরেই। কিন্তু ভারতীয়রা কেন তাহলে বুট পরত না? এর কারণ হিসেবে আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকেই প্রধান হিসেবে দেখা হয়। তখনকার ভারতীয় সমাজে জুতো পরার অভ্যাস খুব একটা দেখা যেতো না। ফুটবল’ই হোক আর যেকোনো খেলাই হোক জুতো পরার চিন্তাই করতে পারতো না এই ভারতীয়রা।

এছাড়াও জানা যায় যে, ব্রিটিশদের মধ্যে বুট পরে খেলার যে একটা সংস্কৃতি রয়েছে তার বিরুদ্ধে ভারতীয়দের বুট ছাড়া খেলার একটা জেদ কাজ করে। ১৮৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটিশরা যখন গোরা ময়দানে খেলছিল, তখন নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী (ভারতে ফুটবল খেলার জনক হিসেবে খ্যাত) পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খালি পায়ে বলটা লাথি মেরে সৈন্যদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল খালি পায়ে কোনো ভারতীয়ের প্রথম কিক।

মূলত এ থেকেই ধারণা করা  হয় যে, আর্থসামাজিক আর সংস্কৃতিগত কারণই হলো ভারতের ফুটবলারদের খালি পায়ে খেলার মূল কারণ।

আবার অনেকের ধারণা, আর্থিকভাবে অসচ্ছলতাই ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহারে বাধ্য করে। ভারত থেকে ব্রাজিলে যাতায়াতের খরচ বাবদ যা খরচ হবে তা বহনের ক্ষমতা ছিলনা বলেই ভারত বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এটা কতটা সত্য সেটা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ! কারণ ভারত যখন তাদের আর্থিক অবস্থা জানায়, তখন আয়োজক দেশ ব্রাজিল  নিজ দায়িত্বেই তাদের যাতায়াতের সমস্ত খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরও কেনো ভারত বিশ্বকাপ খেলেনি সেটাই বড় প্রশ্ন?

ভারত বিশ্বকাপ না খেলার পিছনে কী এমন কারণ ছিল? অনেকে মনে করেন বিদেশি মুদ্রার অভাব , খালি পায়ে খেলার অভ্যাস , দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ভীতি এবং বিশ্বের সেরা দলগুলির বিরুদ্ধে খারাপ ফলের আশঙ্কা থেকেই তাদের বিশ্বকাপ থেকে পিছপা হওয়ার মূল কারণ। অনেকের আবার ধারণা ভারত ৭০ মিনিটের খেলায় অভ্যস্ত, সে জায়গায় বিশ্বকাপ ৯০ মিনিটের হওয়ায় ভারত বিশ্বকাপ থেকে সরে আসে।

তবে পরবর্তীকালে ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় দলের অধিনায়ক শৈলেন মান্না “স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড” পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে জানান যে,” আমাদের বিশ্বকাপ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, আমাদের কাছে অলিম্পিকই ছিল শেষ কথা। আমাদের কাছে অলিম্পিকের চেয়ে বড় কিছু ছিল না, এবং যেহেতু বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না, মূলত সে কারণেই আমরা বিশ্বকাপ থেকে সরে আসি। বিশ্বকাপ সম্পর্কে সঠিক জানাশুনা থাকলে আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা করে অংশগ্রহণ করতাম।”

তিনি আরো বলেন, বিশ্বকাপ খালি পায়ে খেলা নিয়ে যে মিথ বা মিথ্যা ধারণা প্রচলিত সেটা পুরোপুরি মিথ্যা। মূলত AIFF(All India Football Federation) নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তকে ধামাচাপা দিতেই এমন মিথ্যা রটনা ছড়িয়েছে।

শেষ কথা

২০১৭ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ভারত এবং এতে অংশও নেয় তারা। অথচ এর আগে ১৯৫০ সালে একবার বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল ভারতের।সেই ইতিহাস এখনকার ক্ষুদে অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছেই অজানা। তাই আজকের এই আর্টিকেলে সেই ভারতীয় ফুটবলের করুণ ইতিহাস কে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ভারত খালি পায়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিবে, নয়তো না এমন একটা মিথ্যা প্রচলিত ছিল যাদের মাঝে। আশা করছি তাদের দ্বিধা এই আর্টিকেলটি পড়লেই মিটে যাবে।

তবে ১৯৫০ সালের সেই সুবর্ণ সুযোগ যদি কাজে লাগাতে পারতো ভারত, তবে আজকে নতুন একটা অবস্থানে থাকতো ভারতীয় ফুটবল দল।

More Explore:

এক পলকে বাংলাদেশের ইতিহাসের ১০ সেরা ব্যাটসম্যান

পৃথিবীর সেরা ১০ টি ঐতিহাসিক স্থান-জানার আছে অনেক কিছু!

Recent Posts