এক পলকে বাংলাদেশের ইতিহাসের ১০ সেরা ব্যাটসম্যান


বর্তমান বিশ্বে খেলাধূলার ক্ষেত্রে ফুটবলের পরই জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে ক্রিকেট। ক্রিকেট মাঠে বাংলাদেশের ভূমিকা দিন দিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী কিছু খেলোয়াড় আমরা আমাদের মাঝে আগেও পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি। ব্যাটিং, বোলিং, উইকেট কিপিং- সবকিছু মিলিয়েই ক্রিকেট খেলা হয়ে ওঠে জমজমাট! 

আজকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দশ ব্যাটসম্যান এর ব্যাপারে কিছু তথ্য-উপাত্ত পরিবেশন করা হয়েছে। তো চলুন জেনে আসি সেই সৌভাগ্যবান কারা! 

বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দশ ব্যাটসম্যানঃ

১) আকরাম খানঃ

আকরাম খান

আকরাম খানের সম্পূর্ণ নাম মোহাম্মদ আকরাম হুসেইন খান। জন্ম চট্টগ্রামে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলের যে উদ্বোধনী টেস্ট ম্যাচ হয় তাতে তিনি উপস্থিত ছিলেন। 

তিনি মারকুটে ব্যাটসম্যান নামে খ্যাত।সেই সাথে তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্থপতি বলা হয়। তার অধিনায়কত্বেই বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ আসরে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করে। তার ব্যাটিং গড় ১৬.১৮ ও সর্বোচ্চ রান ৪৪। 

২) মিনহাজুল আবেদীন নান্নুঃ

মিনহাজুল আবেদীন নান্নু

যে ক’জন হাতে গোনা মেধাবী ও প্রতিভাবান ক্রিকেটারের উজ্জ্বল পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতে বিশ্বকাপের টিকেট নিশ্চিত করেছিলো, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু সেই তালিকার একেবারে উপরের দিকের একজন। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিনি সর্বদা মেধাবী ব্যাটসম্যান হিসেবে সমাদৃত। 

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি জাতীয় দলের সদস্য ছিলেন। যারা তাকে দেখেছেন তারা জানেন তিনি কতোটা স্টাইলিশ ও নিখুঁত ব্যাটসম্যান ছিলেন। 

প্রথম শ্রেণিতে ২৪ ম্যাচে ৫১.৭৮ গড়ে তার রান ১৭০৯। ডাবল সেঞ্চুরিও আছে তার। খেলেছেন ২১০ রানের ইনিংস, সেঞ্চুরি মোট ৪টি, হাফ সেঞ্চুরি ৯টি। লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন ৬৫টি, রান ১৫৬৭। তিনি সর্বোচ্চ ১০৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছেন। তার সেঞ্চুরি ১টি, হাফ সেঞ্চুরি ১২টি।

৩) হাবিবুল বাশারঃ 

হাবিবুল বাশার

হাবিবুল বাশারের জন্ম ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলায়। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। তাকে বাংলাদেশের সফলতম টেস্ট ব্যাটসম্যান বলা হয়। 

তার দক্ষ নেতৃত্বে দুর্বল শক্তি থেকে উদীয়মান শক্তিতে পরিণত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তার অধীনেই বাংলাদেশ দল প্রথম কোন টেস্ট ম্যাচে জয়লাভ করে। তাছাড়া প্রথম ওয়ানডে সিরিজে জয়ও তার নেতৃত্বেই অর্জিত হয়। 

তাকে ‘মিস্টার ফিফটি’ উপাধিতে ডাকা হয়। এক নজরে তার ব্যাটিং কেরিয়ার হলো- ৫০টি টেস্ট কেরিয়ারে ৯৯ ইনিংসে ৩০২৬ রান, সেঞ্চুরি ৩টি, হাফ সেঞ্চুরি ২৪টি, সর্বোচ্চ স্কোর ১১৩। ওয়ানডেতে ১১১ ম্যাচে রান ২১৬৮, হাফ সেঞ্চুরি ১৪টি, সর্বোচ্চ স্কোর ৭৮। 

৪) সাকিব আল হাসানঃ 

 সাকিব আল হাসান

সাকিব আল হাসানের জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ মার্চ মাগুরা জেলায়। বাংলাদেশ জাতীয়  ক্রিকেটে দলের তিনি একজন অলরাউন্ডার। ব্যাটিং এর দিক দিয়ে তিনি একজন বাঁ হাতি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দশ ব্যাটসম্যান-দের অন্যতম তিনি।  

বিগত ২০১৯ বিশ্বকাপ ছিল তার জন্য স্পেশাল যেখানে তিনি দুর্দান্ত ব্যাটিং পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। বাংলাদেশ টিম সেই সময় খারাপ খেললেও মাঠে সাকিব আল হাসানের নৈপুণ্য ছিলো অনবদ্য। মোট ৮টি ম্যাচে ২টি সেঞ্চুরি ও ৫টি ফিফটিতে ৬০৬ রান করে রেকর্ড গড়েন তিনি। 

একটি মজার বিষয় হলো পুরো বিশ্বকাপ আসরে তিনি একটি ব্যাটই ব্যবহার করেছিলেন যা পরবর্তীতে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে নিলামে বিক্রি করে দেন। শুধুমাত্র সাকিব আল হাসানের কারণেই ২০১৯ বিশ্বকাপ বাঙ্গালী  জাতির মনে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে। 

৫) মুশফিকুর রহিমঃ 

মুশফিকুর রহিম

মুশফিকুর রহিমের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৯ জুন বগুড়া জেলায়। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তিনি একজন উইকেট কিপার ও সাবেক অধিনায়ক। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মনে করা হয় তাকে। তাছাড়া টেস্ট ক্রিকেটেও দেশের সর্বোচ্চ রানের মালিক তিনি। 

২০১৩ সালে গোল্ড টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেন তিনি। যে ব্যাট দিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন তা এতদিন সযত্নে আগলে রেখেছিলেন। গত বছর কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অসহায় মানুষের জন্যে ফান্ড কালেকশনের উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় এই ব্যাটটি নিলামে তুলেন তিনি।

৬) তামিম ইকবালঃ 

তামিম ইকবাল

তামিম ইকবালের জন্ম ১৯৮৯ সালের ২০ মার্চ চট্টগ্রামে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান তার চাচা এবং সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল তার বড় ভাই। তিনি একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও বাংলাদেশ দলের বর্তমান অধিনায়ক।

তাকে বাংলাদেশের ‘ব্যাটিং স্তম্ভ’ বলা হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব ফরমেটে ১০ হাজার রান করার রেকর্ড আছে তার। ওয়ানডে ক্রিকেটে পর পর ৪টি ম্যাচে ৪টি হাফ সেঞ্চুরি করার কীর্তিও আছে তার ঝুলিতে। 

শুধু দেশের ব্যাটসম্যানদেরই নয়, শ্রীলঙ্কার অন্যতম ব্যাটসম্যান সনাথ জয়াসুরিয়া রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছেন তিনি! টেস্টে ৩ হাজার ৯৮৫, ওয়ানডেতে ৬ হাজার ১৮ এবং টি-টোয়েন্টিতে ১ হাজার ৪৪০ রান আছে তার সংগ্রহে। 

৭) মোহাম্মদ আশরাফুলঃ 

মোহাম্মদ আশরাফুল

মোহাম্মদ আশরাফুলের জন্ম ৭ জুলাই ১৯৮৪ ঢাকায়। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সেরা একজন ব্যাটসম্যান ও সাবেক অধিনায়ক। সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড তার রয়েছে। শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কারই বিপক্ষে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। 

২০০৭ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে তৎকালীন এক নম্বর ক্রিকেট দল দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তিনি ৮৩ বলে ৮৭ রান করেন যা বাংলাদেশকে একটি স্মরণীয় বিজয় এনে দেয়। এতে তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ খেতাবে ভূষিত হোন। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম অধিনায়ক।

৮) শাহরিয়ার নাফিসঃ 

শাহরিয়ার নাফিস

শাহরিয়ার নাফিসের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১ মে ঢাকা জেলায়। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম স্বীকৃত বাঁ হাতি ওপেনার। 

তিনি একমাত্র বাংলাদেশী ক্রিকেটার যার পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করার রেকর্ড আছে। যেকোন ভার্সনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বছরে হাজার রানের রেকর্ড অন্য কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের নেই যেটা আছে শুধুমাত্র শাহরিয়ার নাফিসের। এক কেলেন্ডার ইয়ারে ওয়ানডেতে ১০৩৩ রানের রেকর্ড করে ২০০৬ সালে তিনি সেই ইতিহাসটি রচনা করেন। 

৯) মাহমুদউল্লাহ রিয়াদঃ 

 মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহ জেলায়। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তিনি একজন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। 

২০১৯ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪১ বলে ৬২ রানের ইনিংস করে রেকর্ড বইয়ে নাম লিখান তিনি। টি-টোয়েন্টি ফরমেটে তিনিই প্রথম বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান যিনি পাঁচে নেমে এই সংগ্রহ পান। ৬২ রানের ইনিংস গড়তে ৫টি ছয় মারেন তিনি যা একটি রেকর্ড। কেননা ব্যাটিং পজিশন বিবেচনায় ৫ নম্বরে তো বটেই, টি-টোয়েন্টিতে যেকোন পজিশনে নেমেই এক ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ড এটি। 

১০) সৌম্য সরকারঃ 

সৌম্য সরকার

সৌম্য সরকারের পুরো নাম সৌম্য শান্ত সরকার। তার জন্ম ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সালে সাতক্ষীরা জেলায়। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই টিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যান। 

২০১৫ সালেই তিনি তিনবার ম্যান অব দ্য ম্যাচ খেতাব অর্জন করেন। যখন বাংলাদেশ টিম ঘন ঘন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল তখন তার সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সময় তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের সর্বশেষ ম্যাচে এই সৌম্য সরকারই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করেন। 

বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে করেছেন ডাবল সেঞ্চুরি। গত বছর বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে একই সাথে ইনিংস ধরে রাখা ও দ্রুত রান তোলা দুটো দায়িত্বই সফলতার সাথে পালন করেছেন তিনি। 

শেষ কথা :

বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দশ ব্যাটসম্যান-দের প্রতি শুভ কামনা থাকলো। সেই সাথে আগামীতেও বাংলার ক্রিকেট মাঠে এরকম আরো উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটুক দেশবাসী সেই প্রত্যাশাই করে। 

Explore More:

পৃথিবীর সেরা ১০ টি ঐতিহাসিক স্থান-জানার আছে অনেক কিছু!

Recent Posts